নাম : নিশিকান্ত
জোয়ারদার
পিতা : বিষ্ণু
জোয়ারদার
গ্রাম :
গোপালখালি, ইউনিয়ন
:
গঙ্গারামপুর
ডাক :
কাশিয়ানগর
থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : এস. এস. সি.
১৯৭১ সালে
বয়স : ২৬
১৯৭১ সালে
পেশা : কৃষিকাজ
বর্তমান
পেশা : কৃষিকাজ
প্র: ১৯৭০
সালের নির্বাচন
এবং তার
পরবর্তী ঘটনা
প্রবাহ
সম্পর্কে আপনি
কি জানেন ?
উ: সেই
নির্বাচনে
আমাদের
এলাকায়
আওয়ামী লীগ বিপুল
ভোটে বিজয়ী হয়। আমরা সব
আওয়ামী লীগকে
ভোট দিছিলাম। ইলেকশনের
পর আমাদের
এখানে এমন
একটা কথা শুরু
হইলো যে, হিন্দুরা সব
আওয়ামী লীগকে
ভোট দিছে। তা না হলি এতো আসন
আওয়ামী লীগের
পাওয়া সম্ভব
না। আমাদের
এখানকার কিছু
কিছু মুসলমান
আমাদের উপর
তখন দোষ দিতি
লাগলো। কিছু
কিছু লোক বলতি
লাগলো, হিন্দুদের এ
দেশ থাইকে
তাড়ায় দিতি
হবি। সেই
নির্বাচনে তো
সারা দেশেই
আওয়ামী লীগ
জয়যুক্ত
হইছিলো। কিন্তু আওয়ামী
লীগকে
পাকিস-ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া খান
ক্ষমতা দেয়
নাই। তখন
আন্দোলন আরো
জোরদার হয়ে
ওঠে।
প্র: পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চের
আক্রমণ
সম্পর্কে
আপনি কিছু
জানেন কি বা
কিছু শুনেছিলেন
কি ?
উ: ২/৩ দিন পর
শুনিছিলাম যে,
পাকিস্তানি
বাহিনী ঢাকায়
আক্রমণ করিছে। তারা বাঙালিদের
মাইরে
ফেলাইতেছে। তার ১৪/১৫
দিন পর পাকিস্তানি
বাহিনী
আমাদের
এলাকায়
গানবোট নিয়া
আইসে পড়ে। তারা গানবোট
নিয়া চালনায়
আইসে
গুলিগালা করিছে।
প্র: কত
তারিখের ঘটনা
সেটা ?
উ: সঠিক তারিখ
আমি বলতি
পারবো না। চালনা
বাজারে
আমাদের
এলাকার হরিপদ
সাহার একটা
দোকান ছিলো। হরিপদ
সাহা একটা
নৌকায় তার
দোকানের
মালপত্র নিয়া
বাড়িতে
আসতেছিলো। তখন সৈন্যরা
তাকে ধরে। আমরা এই খবর
বাড়িতে বসি
পালাম। এর
কিছুদিন পর
আমাদের এই
এলাকায়
লুটপাট শুরু হইলো। এই লুটপাট
শুরু হওয়ার
আগে আমি একদিন
চালনা গেছিলাম। আমি একা
না। আরো
কয়েকজন আমার
সঙ্গে ছিলো। এটা বৈশাখ
মাসের শেষ
দিকের ঘটনা। সেদিন
বুধবার ছিলো। আমরা নৌকা
করি চালনা
বাজারের দিকে
যাই। চালনার
কাছাকাছি
পৌঁছায়ে দেখি
যে,
কয়েকটা
নৌকা চালনা
বাজারের দিকে
যাতিছে। তারপর
দেখলাম যে,
বহু
মুসলমান বড় বড়
নৌকা করি
রামপাল থানার
দিক থাইকে ধান,
গরু
বাছুর আনতেছে। ঐ দিকের সমস্ত
ঘর-দরজায় আগুন
ধরানো। দাউ
দাউ করি
বাড়িঘরে আগুন
জ্বলতিছে। ওটা দেখি
আমরা ওখান
থাইকে
তাড়াতাড়ি
বাড়ি ফিরি
আসিলাম। তার পরদিন
বৃহস্পতিবার
সকাল ১০টা
১১টার দিকে
আমাদের পাশের
গ্রামে
চেঁচামেচি
শুরু হইলো। কিছু পরেই ওই
গ্রামে
কতকগুলো
বাড়িতে আগুন
দেখলাম। তারপর ওই
গ্রামের
কাছাকাছি
যাইয়া দেখলাম
যে,
মুসলমানরা
আমাদের
হিন্দুদের
গরু-বাছুর এবং
ধান-টান জোর
কইরে ছিনায়
নিয়া যাতিছে। তার পরদিন
আমাদের
এখানেও
লুটপাট শুরু
হয়া গেলো।
পাশের
গ্রামের
লুটপাটের
ঘটনা দেইখা
বৃহস্পতিবার
দিনগত রাতেই
আমি ৪/৫ জনকে
সঙ্গে নিয়া প্রাক্তন
সংসদ সদস্য
হারুন-অর
রশিদের
আব্বার কাছে
গেছিলাম। তাদের বাড়ি
দেওতলা
গ্রামে। তার বাবা তখন
বেশ
প্রভাবশালী
লোক ছিলেন। তার কাছে
আমরা পরামর্শ
নিতি গেছিলাম
যে,
এই
অবস্হায় আমরা
এখন কি করবো। তিনি
আমাদেরকে
বললেন যে,
এই
গ্রামের যারা
গরীব লোকজন
আছে তাদেরকে
কিছু ধান-টান
দিলি তোমরা
সকলে মিলি শান্তিতে
থাকতি পারবা। তাকে আমরা
কইলাম যে,
আমাদের
একটু সময় দেন। তার ওখান
থাইকে ফিরি
আইসে অনেক
রাতে আমরা
পরিবারের
সবাই মিলি
সিদ্ধান্ত নিলাম
যে,
শুধু
খাওয়ার
ধানটুকু বাদে
অতিরিক্ত সব
ধান আমরা গরীব
মুসলমানদের
দিয়া দিবো। ওই খবরটা
তখনই তার কাছে
আমরা নিয়া
গেলাম। যাইয়া
তাকে বললাম যে,
আমরা
আমাদের
অতিরিক্ত সব
ধান আপনাদের
দিয়া দিবো। ঐ ধান আপনারা
গরীব
মুসলমানদের
বিতরণ করি দিবেন। কিন্তু
আমাদেরকে
আপনারা একটু
নিরাপদে
রাখার চেষ্টা
করেন। তখন
উনি
গ্রামের সব
গরীব
মুসলমানদের আমাদের
সামনে ডাইকে
আনালেন। তারা আইলে
উনি বললেন যে,
তোমরা
যদি এইসব
লোকজনকে
আশ্বাস না দাও,
এদের
তো তাহলি থাকা
সম্ভব না। এরা এখানে
নিরাপদে
থাকতি পারে না। এরা এদের
উদ্বৃত্ত ধান
যা আছে সব
তোমাদেরকে দিয়া
দিবে। তোমরা
পরে যায়ে
সেগুলো নিয়া
আইসো আর
ওদেরকে নিরাপদে
রাখার চেষ্টা
করো। এই কথা
বলার পর উনি
আমাদের বললেন
যে,
এখন
আর তোমাদের চিন্তা নাই। তোমাদের কেউ
কিছু বলবে না। তোমরা
বাড়ি যাও। হারুন-অর
রশিদ সাহেবের
আব্বার কথা
শুনি আমরা খুব
আশ্বস্ত হইয়া
গভীর রাতে
বাড়ি চলি
আসলাম। বাড়ি
আইসে আমরা সব
ঘুমাই পড়লাম। কিন্তু
রাত
শেষ না হতিই
খুব সকালে
আমাদের
বাড়িতে বহু লোক
আইসে হাজির। তাদের হৈ
চৈ আর
কথাবার্তায়
আমাদের ঘুম
ভাইঙে গেলো। ঘর থাইকে
বাহির হইয়া
দেখি বাড়িতে
অনেক লোকজন।
প্র: এই
লোকগুলো
কোথাকার ?
উ: এরা সব
হারুন-অর রশিদ
সাহেবদের
বাড়ির আর দেওতলা
গ্রামের। তারা অনেক
লোক।
প্র:
আপনারা
আপনাদের
উদ্বৃত্ত সব
সব ধান তাদের
দিয়ে দেবেন
বলেছিলেন। সেই
কথাতেও কোনো
কাজ হয়নি ?
উ: না। বোধহয়
তাদের অন্য
কোনো মতলব
ছিলো। তা
না হলি তারা
তো আর আসতো না। আমার তখন
কুড়ি-বাইশটা
গরু ছিলো। গরুগুলার
দড়ি কাইটে
কিছু লোক গরু
নিয়া চলি গেলো। আর কিছু
লোক আমাদের
গোলার ধান এবং
আর আর জিনিসপত্র
নিয়া শুরু
করলো। আমার
ঘরের ভিতরের
জিনিসপত্রে
অবশ্য তখনো তারা
হাত দেয় নাই। আমরা ভয়ে
কাউকে কিছু
বলতি সাহস
করলাম না। তাদেরকে
মারমুখী আর
বেপরোয়া বলেই
মনে হলো।
প্র: তারা
শুধু আপনার
বাড়ির গরু এবং
ধান নিলো,
না
অন্য সবার
নিলো ?
উ: সব হিন্দু
বাড়িতেই তারা
গেলো। সবার
গরু বাছুর,
ধান
লুট করলো। আমাদের
গ্রামের সমস্ত বাড়ি
এবং পাশের
গ্রামের সমস-
বাড়িতে
লুটপাট শুরু
হয়া গেলো। প্রথম দিন
তারা ওগুলাই
বেশি নিছে। আমরা চলি
যাওয়ার পর
অন্য
জিনিসগুলা
নিছে।
প্র: এরপর
আপনারা কি
করলেন ?
উ: আমরা সে দিনই
বাড়ি ছাইড়ে
রওনা দিলাম। দেখলাম যে, এখন আমরা
যদি কিছু করতি
যাই তাহলি
হয়তো জীবনের
ক্ষতি হতি
পারে। সে
জন্য আমরা যে
যার মতো
নিজেদের
সামান্য জিনিস
পত্র নিয়া চলি
গেলাম। বিপদআপদের
কথা চিন্তা করি
আমরা কিছু
জিনিসপত্র
আগে থাইকেই
গোছগাছ কইরে
রাখিছিলাম। কিছু কাপড়
চোপড়, কাসার কিছু
থালা বাসন,
সামান্য
কিছু সোনার
গয়না এবং টাকা। সেদিন
অবশ্য তারা
ওগুলো নেয়নি। আমাদের
নৌকা ছিলো। সেই নৌকায়
কিছু মালপত্র
নিয়া আমরা
ঐদিনই গ্রাম
ছাইড়ে চলি
গেলাম।
প্র: যারা
লুটপাট করলো
তারা আপনাদের
মারধোর করেছিলো
কি ?
উ: না, ঐ দিন তারা
আমাদের কাউকে
মারেনি। কারণ আমরা
কেউ তাদের
লুটপাটে তো বাধা
দেই নাই।
প্র:
আপনারা কোথায়
গেলেন এবং
কিভাবে গেলেন ?
উ: আমরা হাঁইটে
এবং নৌকায়
পার্শ্ববর্তী
বয়ারডাঙ্গা
পর্যন- যাই। নৌকায়
জিনিসপত্র
এবং মেয়েরা
ছিলো। বয়ারডাঙ্গা
আমাদের গ্রাম
থাইকে বেশি
দূরে না। ৪ মাইল দূরে
হবি। সেখানে
একদিন থাকার
পর আমরা
মাইলামারা
গিয়া থাকলাম
আরেক দিন। মাইলামারা
বয়ারডাঙ্গার
পাশের গ্রাম। সেখান
থাইকা আমরা
চলি যাই
ডুমুরিয়া। ডুমুরিয়ায়
আমরা রাতে
থাকি। ডুমুরিয়া
বাজার থাইকে
পরদিন খুব
সকালে আমরা আবার
রওনা হইলাম। ৯-১০ টার
মধ্যি আমরা
চুকনগর
বাজারে পৌঁছি
গেলাম। সেদিন
বোধহয়
শুক্রবার
ছিলো। ওখান
থাইকে আমাদের
হাঁইটে যাইতে
হবি ইন্ডিয়ায়। আমরা
ইন্ডিয়ায়
যাতিছিলাম। ওখান
থাইকে রওনা
হওয়ার আগে
ভাবলাম যে,
আমরা
রান্নাবান্না
করি কিছু খায়ে
যাই। রান্না
বান্না হইলো
আমরা
খাওয়া-দাওয়াও
শেষ করিলাম। এর অল্প
কিছু পরেই
গুলিগালা
শুরু হইয়া
গেলো। সকাল
১১টার কিছু
পরে আমি একটা
শব্দ শুনলাম। শব্দ শুনি
আমি একটু এগোয়
গেলাম যে, ব্যাপারটা
কি, শব্দ
শুনা যাতিছে !
ঘটনাটা কি ? ওখানে
মানুষ তো তখন
অনেক। সব
ইন্ডিয়া যাবে।
প্র:
আপনারা কোথায়
ছিলেন ?
উ: চুকনগর
কালিমন্দিরের
সামনে যে
চালনিটা আছে,
ওর
পাশেই আমরা
ছিলাম। আমাদের
জিনিসপত্র
কিছু নৌকা
থাইকে আইনে
ওখানে
রাখিছিলাম। কিছু
মালপত্র
নৌকায় ছিলো। আমাদের
নৌকাটা আমি
পরে পাইনি। যাহোক, শব্দ শুনি
আমি এক
দোকানদারকে
জিজ্ঞেস
করলাম যে,
ব্যাপারটা
কি ?
উনারা
বললো যে, ওটা
কিছু না। আপনাদের
কোনো ভয় নাই। মিলিটারিরা
মাঝে মাঝে
ঐদিকে আইসে
গুলিগালা করি
আবার ওদিক
থাইকেই চলি
যায়। তারা
এদিকে আসে না। তার ঐ
কথার পরও আমি
একটু এগোয়
গেলাম ওই দিকে। যাইয়াই
দেখি যে, মিলিটারিরা
গুলি করতি
করতি আমাদের
এই দিকেই আসতিছে। গুলি
লাইগে
মানুষজন
সমানে পইড়ে
যাতিছে। ব্যাপারটা
বুঝি উঠতিই
আমার কিছু সময়
লাগছে। মিলিটারিরা
ওখান থাকি
তখনো অনেক
দূরে। এরপর
আমি দৌড় দিলাম
কালি
মন্দিরের
দিকে। ওখানে
আমার
ফ্যামিলি
ছিলো। ভাবলাম
ওদের নিয়া আমি
পালাবো। কিন্তু আমি শেষ
পর্যন- পালাতে
পারি নাই। আমি
মিলিটারিদের
ঘেরাওয়ের
মধ্যে পড়ি
গেলাম।
প্র:
মিলিটারি
কতজন ছিলো ?
উ: আমাদের
ওখানে ৫/৭ জন
ছিলো। সব
মিলি তারা
কতজন ছিলো সেটা
আমি জানি না। মিলিটারিরা
আমাদেরকে যখন
আটকায় ফেললো
তখন এক
ভদ্রলোক
আমাদের
বলতিছিলো, আপনারা
হাত উঁচু কইরে
থাকেন। আপনাদের
কোনো ভয় নাই। ওরা
আপনাদের কিছু
বলবি না।
প্র: যে
আপনাদের হাত
তুলে দাঁড়াতে
বললো সে কি বাঙালি
?
উ: বোধহয়
বাঙালি। সে তো বাংলায়
কথা বলছে। স্হানীয়
কিনা জানি না। দেখলাম যে
সে টুপি মাথায়
এবং
পাঞ্জাবি-পাজামা
পরা। ভদ্রলোক
বললেন যে,
আপনারা
হাত উঁচু করি
আল্লাহু আকবর
বলেন। প্রাণের
ভয়ে আমাদের
অনেকেই তখন
আল্লাহু আকবর
বলিছিলো। আমরা
হিন্দুরা
সবাই আল্লাহু
আকবর বললাম। তারপর ঐ
ভদ্রলোক আইসে
আমাদের বললো
আপনাদের লাইন
দিতি হবি। ওরা
(মিলিটারি)
আপনাদের লাইন
দিতি বলছে। তখন লাইন
দেয়া শুরু
হইলো।
প্র:
আপনিও কি লাইন
দিলেন ?
উ: হ্যাঁ, আমিও
লাইনে ছিলাম। অনেকগুলা
লাইন ছিলো। আমিও এক
লাইনে ছিলাম।
প্র:
আপনারা কতজন
লোক লাইন
দিলেন ?
উ: অনেক লোক। ধরেন একেক
লাইনে ৬০/৭০
জন করি হবি। শুধু আমাদের
ওখানেই না। বাজারের যে
দিকে চোখ যায়
দেখলাম
বিভিন্ন জায়গায়
লাইন। কাতারে
কাতারে লোক। সবাই লাইন
দেওয়া।
প্র: আপনি
যেখানে ছিলেন
সেখানে কটা
লাইন ছিলো ?
উ: ৫টা লাইন। এই ৫টা
লাইনের এক
লাইনের
প্রথমে আমার
এক ভাইপো ছিলো। তার নাম
মনোজ। আরেক
লাইনের
প্রথমে ছিলো
তার বাবা। শেষের দিকের
যে লাইন ছিলো
সে লাইনের
মাঝামাঝি
ছিলাম আমি। তারপরে যখন
মনোজের লাইনে
গুলি হয় তখন
আমি বোধহয়
বেহুশ হইয়া
পড়ি যাই। তারপর
কিছুক্ষণের
কথা আমি বলতি
পারি না। জ্ঞান ফেরার
পর দেখি আমার
চারদিকে লাশ
আর রক্ত। আমার স্ত্রী
আমার হাত ধরি
টানতিছে। আমার হতভম্ব
ভাব তখনও কাটে
নাই।