নাম : নোয়াব মিয়া

গ্রাম : আকবপুর

ডাক : কসবা

ইউনিয়ন : কসবা

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ৩৮

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : চতুর্থ শ্রেণী

১৯৭১ সালে পেশা : চাকরি

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

 

মুক্তিযোদ্ধা নোয়াব মিয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতার কথা আর জনগণের সাহায্য-সহযোগিতার কথা

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণ সম্পর্কে তখন কি শুনেছেন?

 

উ: পাঞ্জাবিরা ঢাকাতে অতর্কিত আক্রমণ কইরা অনেক বাঙালি মানুষ মারছেতারপর আমাদের কিছু ফোর বেঙ্গলের লোকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ছিল তারা ওখান থাইকা এদিগে আইসা পড়লঢাকা থেকে অনেক লোক পায়ে হাইট্টা আইসা পড়লোতাঁদের কাছ থেইকা পাঞ্জাবিদের অত্যাচারের কথা শুনলাম

 

প্র: আপনার এলাকায কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করল?

 

উ: ১লা বৈশাখ বুধবার ছিলতারা সকালে আসছে আইসা আক্রমণ করে

 

প্র: কিভাবে আক্রমণ করেছিল?

 

উ: তারা রোডদা টি আলী সাবের বাড়িতে আইসা আমাদের এখানে ফায়ার করা আরম্ভ করছেযখন গুরি করা আরম্ভ করছে তখন আমাদের এখানে তৎকালীন সি ও ছিল ইজ্জ্বত আলী সাহেবউনি যখন দৌড়াইয়া যায় তখন মানুষজন উনাকে জিজ্ঞাসা করলো স্যার,আপনি দৌড়াইতেছেন কেন? তখন বলল যে,পাঞ্জাবি আসছে,মানুষ মারতেছেকোথায়? কইল যে টি আলী সাবের বাড়িতেতখন আমি ঐ দিগতে আস্তেস্তে এগিয়ে আসলামআইসা দেখি যে ঠিকই,এরা এক দুইটা কইরা ফায়ার করতাছেতখন থানাত যাইয়া আমা বন্দুক আনলামতখন থানার পুলিশ এবং দারোগা দৌড়াইয়া কমলাসাগরের পাড়ে উইঠা গেছেতখন আমরা অস্ত্রাগার ভাইঙ্গা তা থাইকা বন্দুক আইন্যা এই খানদা এই শিতলপাড়ার পশ্চিমে থাইকা পুস্কুর্নির ভিতর থাইকা এদের দিকে বন্দুক দিয়া ফায়ার দিছিকিন্তু ঠেকাইতে পারি নাইপরে আমরা পিছু হটছি

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আপনার এলাকায় এসে কি করল?

 

উ: আইসা লুটতরাজ করলতারপর মানুষ মারল,মেয়েদের উপর নির্যাতন করা আরম্ভ করলবাড়িঘরে আগুণ ধরাই দিল,মালপত্র সব লুট করা আরম্ভ করলটাকা পয়সা নিলসুন্দর মেয়ে দেখলে এদের উপরে নানান ধরনের অত্যাচার অত্যাচার আর জোর জুলুম আরম্ভ করল বা এদের উপরে নির্যাতন আরম্ভ করলযারারে একটু জোয়ান মনে হয় তাদেরে মারা শুরু করলো

 

প্র: আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছিল?

 

উ: আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয় নাইআমার এক ছোট ভাই আবু তাহের,সে ই.পি.আর-এ ছিলসে ঠাকুরগাঁয়ে আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়েছে?

 

উ: মার্চ মাস থাইকাই আমাদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা আরম্ভ হয়েছে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিল?

 

উ: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব খুভই ভাল ছিলতারা নিজেরা না খেয়ে মুক্তিবাহিনীর লোক পাইলে তাদের খাওয়াইতোযতটুকু সাহায্য তাদের করা দরকার তার চাইতে অনেক বেশি সাহায্য তারা করছে

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?

 

উ: আমরাতো তৎকালীন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিলামরাজাকার অথবা দালাল আমাদের এই এলাকায় ছিল নাদালাল ছিল আমাদের পশ্চিম এলাকায়রাজাকার প্রত্যেক গ্রামেই বহুত ছিলআমাদের এই কসবার সাইডে দিয়া বা আমাদের যে গ্রাম আকবপুর,এইসব সাইডে কোনো রাজাকার বা দালাল ছিল না

 

প্র: আপনি কোন কোন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন?

 

উ: ২ নম্বর সেক্টরে আমরা যুদ্ধ করেছিপ্রথম যুদ্ধতো আমাদের কসবা থাইকাই আরম্ভ হইলপ্রথম যেদিন পাঞ্জাবি আসল সেদিন থাইকাই আরম্ভ হইলআমরা এই সময়দা পাহাড়ে যাইয়া থাকতামআমাদের এখানে ক্যাপ্টেন গাফফার সাব ছিলপ্রথম ৩০/৩৫ জন লোক আসলএকবারে খারি শরীলকারো প্যান্ট,কারো গায়ে গেঞ্জি, কারো গেঞ্জিও ছিল নাতারা আইসা প্রথম আমাদের কাছে খাবার চাইলতাদের জিজ্ঞাসা করলাম,কইল যে আমরা ফোর বেঙ্গলের লোকআমরা মুক্তিবাহিনীদেখলাম তারা আমাদের মতনই লোকআমরা তাদের খাওয়াইলাম এবং তাদের যতটুকু সাহায্য করা দরকার করলাম এবং তাদের সাথে আমরাও যুদ্ধ আরম্ভ করলামএইখান থাইকা আমরা মন্দভাগ পশ্চিম এলাকার চাদলা,সিধলা,এরপরে কুমিল্লা পর্যন্ত গেছি

 

প্র: আপনার সাথে আর কারা কারা ছিলেন?

 

উ: এই এলাকার ছিল চরনালের ফিরোজ মাস্টার-তখন মাস্টার ছিল না,তখন ফিরোজ মিয়া,কাইয়ুম ছিল, জাহাঙ্গীর ছিল,তারপর রাজা মিয়া ছিল,হারুন মিয়া ছিল,আবুল হাই ছিল,মধু মিয়া ছিল,নূরুল হক ছিল,নূরুল ইসলাম ছিল,তাজুর ইসলাম ছিল আরো অনেক লোক ছিল

 

প্র: যুদ্ধ শেষে গ্রামে এসে কি দেখলেন?

 

উ: গ্রামে এসে দেখলাম যে,আমাদের বাড়িঘরগুলি শেলিংয়ে,বোমে একবারে জর্জরিত হইয়া গেছেমসজিদ, মাদ্রাসা যেইগুলি ছিল বা মন্দির ছিল-এইগুলির কোনো অসি-ত্ব নাইনয় মাস যাবৎ দূর্বা দার্বা উইঠা এক্কেবারে ভইরা গেছেআর যেগুলির মধ্যে শেলিং পড়ছিল সেগুলির কিছুই ছিল না

 

প্র: রাস্তাঘাট ব্রিজের অবস্হা কি ছিল?

 

উ: রাস্তাঘাট ব্রিজ তো সব পাঞ্জাবিরা ভাইঙ্গা চুরমার কইর দিছে যাতে মুক্তিবাহিনীরা চলাচল করতে না পারে, আসতে না পারে

 

প্র: এলাকায় কি মাইন পুতেছিলো?

 

উ: যথেষ্ট মাইন ছিলদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে মাইনে পরে বহুৎ মানুষ মরছে,কারও হাত গেছে,কারও পাও গেছেগরু ছাগলও মরছে বহুৎ

 

প্র: যুদ্ধ শেষে আপনার অস্ত্র কোথায় জমা দিলেন?

 

উ: যুদ্ধ শেষে আমাদের অস্ত্র যার যার কমান্ডারের কাছে জমা দিলাম

 

প্র: আপনার কমান্ডার কে ছিলো?

 

উ: আমাদের কমান্ডার ছিলো ফিরোজ মিয়াআর এইদিক দিয়া ছিল লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির সাহেব

 

প্র: যুদ্ধের শেষে অস্ত্র জমা দিযে বাড়িতে এসে কি করলেন?

 

উ: বাড়িতে আইসা আর কি যার যার বাড়িঘর ঠিক ঠাক করা বা আপনজনদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা,যার যার দুঃখ-সুখ শোনা এইতো ছিলতারপর যুদ্ধের সময় আমাদের যে লোকগুলি মারা গেছিল তাদের আমরা কবর দিয়েছিলাম লক্ষ্মীপুরঅহন শুনছি সেখানে অনেক কিছু হইতেছেতারপর আবার এই খিরনালে মকবুল মিয়ার বাড়ির একটু পশ্চিমের সাইডেও একটা গণকবর আছে

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : সোলেমান খান

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৩৩