নাম: অমলেন্দু সাহা

পিতার নাম : লাল মোহন সাহা

গ্রাম: কুঠি

ডাক: কুঠি

ইউনিয়ন: কুঠি

থানা: কসবা

জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স: ৩০

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা: এইচ. এস. সি. পাস

১৯৭১ সালে পেশা: ব্যবসা

 

 

অমলেন্দু সাহা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন,অস্ত্র হাতে লড়াই করেননিকিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেনতিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেরে কথা যেমন কলেছেন-তেমনি রাজাকারদের কথা,শান্তি কমিটির সদস্যদের কথাও নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন

 

প্র: আপনি কি পরিস্হিতিতে ভারতে গেলেন ?

 

উ: স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার প্রায় মাস দেড়মাস পর আমরা ভাবছিলাম যে, মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধ কইরা পাকিস্তানের সোলজাররা বোধহয় টাউনেই সীমাবদ্ধ খাকবোগ্রামে যে তারা আসবে এটা আমরা ভাবি নাইকিন্তু আমরা আতঙ্কে ছিলাম কোন সময় কি আক্রমণ হয়কিছু কিছু এলাকায় এমন কিছু লোক ছিলো যারা নাকি পাকিস্তানি বাহিনীর হয়ে সব সময় স্পাইং করতোআমি আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত ছিলাম বলে একটু ভয়ে থাকতামআওয়ামী লীগের নেতারা বা অন্য যারা ঢাকার কি নরসিংদীর তারা কুঠি দিয়া যাওয়া-আসা করতোআমরা পারে গুদামে যে ক্যাম্প করেছিলাম তাদেরকে সেখানে আশ্রয় দিছি,খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্হা করেছিআর এসব করেছি একটি কমিটির মাধমেআমরা এখানে একটা কমিটি করেছিলামএভাবেই আমরা কাজ করছিলামএই সময়ে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর লোক খবর লইলো যে,পাক আর্মিদের গাড়ির একটা বহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে চইল্লা গেছে,পাঁচ ছয়টা গাড়ি কুঠির দিকে ঢুকতাছেযেই মাত্র গলি দিয়া ঢুকছে শুনছি তহনি আমরা গ্রামের লোক হিন্দু-মুসলমান যারা ছিলাম,যারা আওয়ামী লীগের তারা এবং বলা যায় সমস- ইউনিয়নের লোক গ্রাম থেইক্যা আমরা পশ্চিম দিকে চলে গেলামআমরা কোনো মতে জান চাঁচাইছিযাওয়ার সময় আমরা খালি হাতেই চলে গেছিযারা নাকি ছিল তাদেরকে গুলি কইরা মারছেতখন আমাদের এই কুঠিতে গ্রাম পুলিশ ছিলো দুজনএই কুঠিতে চেয়ারম্যান ছিল যদু মিঞা সরকার,কমিটির সভাপতিউনি বললেন তুমি তো গ্রাম পুলিশ,তোমাকে মারবে কেন? তোমরা যাইও নাতখন সে ভাবছে আমি গ্রাম পুলিশ যহন আমার পোশক আছে আমাকে মারবে নাকিন্তু পাঞ্জাবিরা প্রথমে তাদেরকেই মাইরা ফেললোতাদের নাম হইলো চন্দ্রমোহন দাস আর একজনরে টেনু দাস নামে ডাকতোতারা দুই ভাইদুভাই মারা গেলআর মারলো তার বাবাকেসতীশ সাহারে মারলো বাজারে ঢুইক্যাইসহীশ সাহা শংকরের বাবাআর মারলো অতুল সাহাকে,তারপরে বিনোদ বিহারী সাহা আর প্রেমানন্দ সাহাকেতৎকালীন ব্যাংকে চাকুরি করতো একটা লোক,নামটা মনে নাই আমারগার্ড ছিলএই পরিস্হিতিতে আমরা ভারত চইলা গেলাম

 

প্র: আপনার এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধী কারা ছিল? তাদের ভূমিকা কি ছিল?

 

উ: শান্তি কমিটির সেক্রেটারি ছিল মুসিকুর রহমান সুনু মিঞা,মনু মেম্বার ছিলআবদুল কুদ্দুস মিঞা, চেয়ারম্যান ছিলআর ছিল আমাদের পাশের গ্রামেরই রশিদ মিঞা,গণি মিঞা এবং হাজী গাজী মিঞাআরও অনেকেই ছিলতারা পাকিস্তানিদের কাজে সহায়তা করতোমুক্তিবাহিনীতে যাতে কেউ না যায় সে সম্পর্কে কাজ করতোশান্তি কমিটি,রাজাকারে মানুষ ভর্তির ব্যাপারে উৎসাহ দিতআর্মিকে তারা সব সময় সহায়তা করছেপাকিস্তানিদের পক্ষে যত কার্যক্রম আছে সব করেছেঅন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর বিপক্ষে তারা কার্যক্রম চালাইতো

 

প্র: পাকিস্তানিরা হিন্দু-মুসলমান কিভাবে বুঝতো?

 

উ: নাম জিগাইছে পাশে যে স্পাই আছেরাজাকারের দল আছে তারা বলছে যে সে হিন্দুতাকে দেখাই দিছেতারা আইসা সাইরা তাদেরকে লেলিয়ে দেওয়া হইলো মানুষের সম্পদ লুট করার জন্যদালালরা তখন সমস- গ্রাম একই দিনে সম্পদ,বাড়িঘর যা আছে সব লুট কইরা লইয়া গেলঐ দিন থেইক্যা আরম্ভ হইছে লুটপাটবাজার থেইক্যা ঘর ভাইংগা মালপত্র সব নিয়া গেছেগ্রামের যে হিন্দুদের এরিয়া ছিল সেখান থেইকা সমস্ত বাড়িঘর ভাইংগা লুট কইরা নিয়া গেছে

 

প্র: আপনি আপনাদের গ্রামের কয়েকজন রাজাকারের নাম বলতে পারবেন?

 

উ: রাজাকারে তখন ফটিক ছিলহরমুজ বলে একটা ছেলে ছিলআরো ছিল তারা অবশ্য পরে মুক্তিবাহিনীতে চইল্যা গেছিলওদুদ মিঞা ছিলতাপরে মাঝখানে ছিল আপনের শহীদ মিঞা বর্তমানে উনি রিটায়ার্ড হইছেনঅবশ্য পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়া অংশগ্রহণ করেছিলেনএছাড়া অনেকে আছে যাদের নাম আমার ঠিক খেয়াল নাইবহুত রাজাকার আছিল

 

প্র: আপনার এলাকার কয়েকজন মুক্তিবাহিনীর নাম বলবেন?

 

উ: আমাদের এলাকায় শফিকুর রহমান,জওহরলাল সাহেব,আবদু মিঞা,মোহাম্মদ শাহ আলম,সন্তোষ সাহা,খোকন,তারপর কি শীল যে ছিল-ঐ শীল ছেলেটার নামটা কিতা? নামটা আমার মনে নাই

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি আপনার গ্রামের অবস্হা কি দেখলেন?

 

উ: দেশ স্বাদীন হওয়ার সাথে সাথে পরের দিন ভোরে আরকি আমরা সদর গ্রামে চইল্লা আইছিআমরা আওয়ামী লীগ সমর্থক যারা ছিলাম,আমরা হিন্দু মুসলমান যারা ছিলাম সবাই একসাথে চইলা আসছিআইসা দেখলাম যে,কুঠির যে রাস্তা এ রাস্তাগুলোতে ঘাষ শুধু ঘাসহাঁটার মতো কোনো অবস্হা নাইআর কসবাতে ঢুকে যখন আমি রেললাইন ক্রস করছি,ক্রস কইরা সাইরা দেখলাম যে,রাস্তাটা আড়া (জঙ্গল) হইয়া গেছেগা

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি কি করলেন? আপনার কর্মকান্ড সম্পর্কে কিছু বলেন?

 

উ: যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যান হইযারা নাকি শরর্ণাথী ছিল,যারা ভারত থেকে আসছে তাদেরকে রিলিফ দেওয়া,তাদেরকে কাপড়চোপড় দেওয়া-তখন তো পুরান কাপড় চোপড় দেওয়া হইতোনতুন কাপড়ও দেওয়া হইছেশাড়ি লুঙ্গি দেওয়া এগুলি আমার নেতৃত্বে হইছে আরকি

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : এইচ. এম. ইকবাল

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ১৩ জানুয়ারি ১৯৯৭

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ১১৪