নাম : পাগলি দাসী মন্ডল

পিতা : কালিপদ মন্ডল

গ্রাম : দেবিতলা, ইউনিয়ন : গঙ্গারামপুর

ডাক : দয়ারডাঙ্গা, থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : নিরক্ষর

১৯৭১ সালে বয়স : ৩২/৩৩

১৯৭১ সালে পেশা : গৃহিনী

বর্তমান পেশা : গৃহিনী

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা আপনার মনে আছে কি ?

 

উ:, মনে আছেআমার ১৫/১৬ বছর বয়সে বিয়া হইছিলোআমি তখন তিনটা ছেলের মা  তার আগে ভোট হইছিলোআমরা সবাই নৌকা মার্কায় ভোট দিছিলামতারপর গন্ডগোল শুরু হইলোহেই বছর দেশে যুদ্ধ লাগিছিলোযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদিন মঙ্গলবারের দিন আমার এক কাকা শ্বশুর আসি আমারে বলতিছে,এই, তোরা এখানে বসে আছিস, ওপারে আগুন নাগাই দিছে, তা দেখছিস ? তাড়াতাড়ি বাড়ি থাকি বাহির হয়া পড়-এই কইয়া উনি চলি গেলোআমি তখন অল্প কিছু জিনিস নিয়া ছেলেগুলারে নিয়া আমার বাপের বাড়ি গেলামআমার বাপের বাড়ি ঐ মোল্লার বাড়ির ওপাশেরাতে আমি ছেলেগুলারে নিয়া বাপের বাড়ি থাকলামআমার ভাই কইলো, অবস্হা খারাপ এহান থাকিও চলি যাতি হবেবুধবার সকালে আমরা বশিরাবাদে আমার মামার বাড়ি রওনা দিছি

 

প্র: এটা কোন মাসে ?

 

উ: বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসেঐ মাসের তিন কি চার তারিখ হবেআমরা মামার বাড়ি যাইতেছি, এর ভিতরে দৌড়াদৌড়ি আর গুলি শুরু হইয়া গেলোতখন আর আমাগো মামার বাড়ি যাওয়া হইলো নানৌকা ঘুরাইয়া ঘাটে আইছিঘাটে আসার পর আমার বাপের বাড়ির আরো কিছু লোক ওই নৌকায় উঠিলোতারপর আমার মেজ কাকা নৌকা ছাইড়া দিছেতখন আমার দু্‌্‌ই ছেলে নৌকায় ছিলো নাঘাটে আসার পর ওরা বাড়ি থাকি আরো কিছু জিনিস আনার জন্য নৌকা থাকি নাইমে গেছিলো

 

প্র: আপনার ছেলেদের তখন বয়স কত ?

 

উ: বড়টার ১৪/১৫মেজোটার ১২ছোটটার ৮ বছরআমার মেজ কাকা নৌকা ছাড়ি দিলে ওরা ঐ নৌকাটা ধরতি দৌড় দিছেনৌকায় আমার স্বামী, আমার তিন ভাই, এক মামাতো ভাই আর কাকারা--আমরা সবাই এক সাথেনৌকাটা অনেক বড়মাঝে মধ্যে নৌকাটা খালের মধ্যি মাটিতে বাইদে যাচ্ছেলোতখন আমার তিন ভাই জলে নামি নৌকা ঠেলে নেচ্ছেলোআর ঐ কৃষ্ণর বাবা দাঁড় টানতাছিলো

 

প্র: কৃষ্ণর বাবা কে ?

 

উ: আমার স্বামীকৃষ্ণ আমার বড় ছেলেএর মধ্যি বর্গি না মিলিটারিরা আইসে পড়লোআমরা ওগো সামনে পইড়া গেলামওরা আমার ভাইদের পথ দেখাই দেওয়ার কথা কইলো

 

প্র: তারা কোন পথ দেখানোর কথা বললো ?

 

উ: বাদামতলার পথ দেখাই দিতে বলছেআমার ভাইটা সে সময় মনে করিলো যে ওরা আমাগো কিছু করবে নাএই মনে করি ওরা আগায় গেছেমিলিটারীরা বলিছে নৌকা ভিড়ায়ে আমাগো সঙ্গে আসোতখন আমার ভাইয়েরা ওগো সঙ্গে গেলো

 

প্র: আপনার স্বামী ?

 

উ: সেও গেলোআমার বড় ভাইটা কইয়া গেছিলো আমাগো কিছু করবি নাআমাগো ক্ষতি করবি নাআমার ওই ভাইয়ের নাম কঞ্জুতারপর আমরা নৌকা থাকি নামি নগেন বাবুর বাড়িতে থাকলামমিলিটারিরা আমার স্বামী  আর ভাইদের দুই ভাগ করি দুই দিকে নিয়া গেলোকৃষ্ণর বাবা মানে আমার স্বামী, আমার ছোট ভাই আর আমার এক মামাতো ভাই মিলিটারিদের সাথে পূব দিকে গেলোওই দিকে মতিরামের বাড়িআর আমার অন্য দুই ভাই আর এক কাকা চইলা গেলো বাদামতলার দিকেযাওয়ার পর পরই মিলিটারিরা আমার বড় ভাইটারে গুলি কইরা দিলো

 

প্র: আপনার স্বামী কে ?

 

উ: আমার স্বামীকেও ওরা ওই পাশে গুলি করিছে শুনিলামতখন তার কি অবস্হা আমি জানি না

 

প্র: আপনি তখন কোথায় ?

 

উ: আমি তখন নগেন বাবুর বাড়িতেওখানে এক মুসলমান আমাগো পাহারা দিয়ে রাখতি লাগলোচারদিকে মিলিটারিতে ভইরা গেছেমিলিটারিরা গুলিগালা কইরা আগুন টাগুন ধরাই দিয়া চইলা গেলোনগেন বাবুর বাড়িতে ওরা আর আগুন দিলো নাযে মুসলমান ওখানে পাহারা দিচ্ছিলো সেও আর তখন ওখানে নাইএকটু পরে দেখি আমার মেজ ভাইটা কোথা থাকি দৌড়ায়া আইসে খালের ভিতর ঝাঁপাইয়া পড়িলোঐ দেখি আমিও নগেন বাবুর বাড়ি থাকি বেরোয়ে বিলির দিকে চলি যাতি লাগলামতখন একজন আমাক ডেকে বলিলো যে, কুঞ্জরে তো গুলি করিছেসে এখনও মরে নাইতুমি তাড়াতাড়ি ওখানে যাও

 

প্র: এ কথা আপনাকে কে বললো ?

 

উ: প্রফুল্ল ঢালীপ্রফুল্ল ঢালীর কথা শুনি আমি সেখানে গেলামআমি প্রফুল্লরে সঙ্গে নিয়া আমার বড় ভাইরে ধরাধরি করি একটা বাড়িতে নিলামকিছুক্ষণ পর আমার মেজ ছেলে ওখানে আইলোদেখিলাম যে, আমার ভাইয়ের বুকে গুলি লাগিছেপিঠ দিয়া গুলি বেরোয় গেছেএকটু পর আমার বড় ভাই কইলো, আমারে কিছু দিয়া ঢাইকা দাওআমার মেজ ছেলেটার কাছে একটা গামছা ছিলোসেই গামছাখান খুলি আমার ভাইরে ঢাইকা দিলোতারপর আমার মামাতো ভাই অনিল আইলোঅনিল বলিলো, আমাগো নৌকা আগুন লাগি পুড়ি গেছে

 

প্র: আপনাদের নৌকায় কিভাবে আগুন লাগলো ?

 

উ: সেটা জানি নামনে হয় মিলিটারিরাই আগুন লাগাই দিছেআমার মেজ ছেলে ওপাশে বইসা বইসা কানতিছিলোসে শুধু বলতেছে আমার বাবাও আসছে না, আমার অন্য মামারাও আসছে নাআমি আর ইন্ডিয়া যাবো নাছোট মানুষ তোসে খুব কান্নাকাটি করতেছেআমি আর আমার মেজ ছেলে আমার বড় ভাইয়ের কাছে ছিলামভাই আমারে জিজ্ঞেস করিলো যে, আর সব কোয়ানে (কোথায়) ? আমি কলাম আছেভাইয়ের কোনো চিকিসা আমরা করতি পারলাম নাসন্ধ্যার পর আমার ভাই মারা গেলো

 

প্র: তারপর কি করলেন ?

 

উ: তারপরে আমি ওখান থাকি চলি আসলামসে সময় আমার আর কান্না টান্না পালো নাতহন আমি ভাবতি নাগলাম যে, আমাগো আর সব কে কোথায় ? কৃষ্ণর বাবা কোথায় ? আমার শ্বশুর কলো যে, আর কোন্‌দিক তাকানো যাবি নাআমাগো এখনই যাতি হবিতখনও কৃষ্ণর বাবা  আসে নাইআমার শ্বশুর আমার হাত ধইরে একটা নৌকায় তুলি দিলো

 

প্র: আপনার ভাইয়ের লাশ ওখানে পড়ে থাকলো ?

 

উ:

 

প্র: তারপরে ?

 

উ: তারপরে মাইলামারা চলি গেলামআমার আর দুইটা ছেলেরও কোনো খবর নাইশুনলাম ওরা আর এক নৌকায়আমি মাইলামারায় ওদের পালাম নাকে যেন আমাক বলিলো, ওরা আর একটা নৌকায় চলি গেছেআমি যে নৌকায় সেই নৌকায় ওখানে আরো যে কয়জনরে পাইলো সেই কয়জনরে তুইলে নিয়া নৌকা ছাইড়ে দিলোনৌকা তারপর ডুমুরের বাজারে গেলোওখানে আমার মাসির ছেলেদের সঙ্গে দেখা হইলোতারা আমার ছেলেদের চিনেওরা আমাগো আসে খবর কলো যে, তাগো পাওয়া গেছেতারা এক জাগায় কানতেছেতারা কলো আপনারা এখানে থাকেন, তাগো আমরা আইনে দেইওরা আমার ছেলে দুটারে খুঁইজা আনিলো

 

প্র: আপনার স্বামী তখন কোথায় ?

 

উ: আমি তারে আর দেখি নাইআর কোনো দিন দেখা হয় নাইমিলিটারিরা তারে মাইরে ফেলিছেতহন আমারে তো কেউ কয় নাই যে সে মারা গেছে

 

প্র: আপনার স্বামী মারা গেছে ?

 

উ:, মতিরামের বাড়ির ওখানেতারে মিলিটারিরা ওখানে মারিছে

 

প্র: এই ঘটনা তখন আপনি জানেন না ?

 

উ: নাআমার শ্বশুর কৃষ্ণর বাবারে দেইখা গেছেকিন্তু শ্বশুর আমারে কিছু কয় নাইমনে করিছে এই খবর পাইলে আমি বিতাল হইয়া যাবো

 

প্র: ডুমুরিয়া বাজার থেকে কোথায় গেলেন ?

 

উ: চুকনগর বাজার

 

প্র: চুকনগর বাজার কখন গেলেন ?

 

উ: চুকনগরে গেলাম সকাল ছয়টার দিকেতখন ভোর

 

প্র: চুকনগর গিয়ে আপনি কি করলেন ?

 

উ: ওখানে রান্না-বারা কইরে কেউ কেউ দুইটা খাইলোকেউ কেউ খালো নাএরপর তো গুলিগালা শুরু হইলো

 

প্র: কখন গুলি শুরু হলো ?

 

উ: আন্দাজ ৯টা ১০টার পরঅনেক দিনের কথা তো !

 

প্র: গুলির সময় আপনি কি বাজারে ছিলেন ?

 

উ:, বাজারে ছিলামতখন চারদিকে ছুটাছুটি শুরু হইলোআমি একদিকে পালায় গেলামআমার এক ভাই কলো যে, জলের মধ্যি বা গর্তের মধ্যি থাকতি হবিচুকনগরে একটা দালান আছেওটার দক্ষিণ ধারে ছোট একটা খালের মধ্যি গলা পর্যন্ত ডুবায় আমরা কয়েকজন বসি থাকিলাম

 

প্র: দালানটা কালিবাড়ির কোন পাশে ?

 

উ: ঐটা আমি কতি পারবো নাদালানটার পাশটায় একটা রাস-াসেই রাস-ার পাশে একটা ছোট খালে পড়ি থাকিলামমিলিটারিরা গুলিটুলি করি চলি গেলো পর ওখান থাকি উঠছি

 

প্র: কতক্ষণ গুলি হলো ?

 

উ: তা অন্তত: ঘন্টাখানেক গুলি চলছেতারপরও ওখানে আরো অনেকক্ষণ থাকছি

 

প্র: যারা গোলাগুলি করেছে তারা কি আপনারা যেখানে ছিলেন সেদিকে যায়নি ?

 

উ: নাকিন্তু আমরা ওখান থাকি ওদেরে দেখিছিওরা আমাগো দেখতি পায়নিওরা চলি যাওয়ার পরে সেইখান থাকি আমরা উঠি আইলাম

 

প্র: উঠে এসে কি দেখলেন ?

 

উ: উঠি দেখিলাম শুধু লাশলাশ পাড়ায় হাঁইটে যাওয়ার মতো অবস্হা ছিলো নারক্তের ধারা জলে নামছিলোআমাগোর কাপড় চোপড় সব কিছু লাল হয়া গেছিলোখাল থাকি উইঠে আইসে লাশ দেইখা আমি অজ্ঞান হইয়া গেছি

 

প্র: আপনার জ্ঞান ফিরলো কখন ?

 

উ: একটু পরযারা আমার সঙ্গে ছিলো তারা কিভাবে যেন আমার জ্ঞান ফিরায়ছে

 

প্র: জ্ঞান ফেরার পর চুকনগর বাজারের কি অবস্হা দেখলেন ?

 

উ: ওরে সর্বনাশ ! সে যে কি অবস্হা, তা আমি বলতি পারবো নামরা লাশ পাড়া দিয়ে বেরোয়ে যাবো এই পথ আর ছিলো নাচারদিকে মানুষ জন কানতেছেখুব ভয় পাইয়া গেছি তখন

 

প্র: ওখানে কত লাশ দেখলেন ?

 

উ: কত মানুষ মরি পড়ি ছিলো সেটা বলতি পারবো নানা হলিও হাজারের উপর মরা মানুষ ওখানে আমি দেখিলাম

 

প্র: এরপর কি ক&