নাম : প্রফুল্ল কুমার ঢালী

পিতা : মহেন্দ্র চন্দ্র ঢালী

গ্রাম : দেবীতলা, ইউনিয়ন : গঙ্গারাম

থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ৩৬/৩৭

১৯৭১ সালে পেশা : কৃষিকাজ

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের কথা কি আপনার মনে আছে ?

 

উ: হ্যাঁ, মনে আছেতার আগে দেশে ভোট হইছিলোসেই সময় আমরা নৌকা মার্কায় ভোট দিছিলামতারপর দেশে যুদ্ধ শুরু হইলোনদীর পাশে আমাদের দেবীতলা গ্রামআমাদের গ্রামের তিন দিকে দরিয়াযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদিকে মিলিটারির ভয় আর অন্যদিকে লুটপাটকারীদের ভয়সেই সময় নদীর পাশ দিয়ে আমাদের ছেলেরা দিনের বেলায় পাহারা দিতোআমরা বয়স্করা সোমত্ত মেয়েদের নিয়া বাড়ি থাকতামএ অবস্হায় বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের ২ তারিখে আমাদের দক্ষিণ পাশের গ্রামে বিহারী এবং বাঙালি মুসলমান লুটেরারা হামলা চালাইলোতখন আমাগো এলাকার যুবক ছেলেরা লাঠি বন্দুক নিয়া তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করিছিলোকিন্তু তারা সফল হয় নাইআমাগো ছেলেরা তাদের সাথে না পারিয়া পিছনে সরে আইলোএরপর লুটেরারা ওই গ্রামে কিছু ঘর বাড়ি পোড়ায় দিলোওই গ্রামের এক পাশে ছিলো রাখাল বাবুর বাড়িউনি খুব ধনী লোক ছিলেনওনার বাড়িতে অনেক লোক লুট করার চেষ্টা করিলে তার বাড়ি থেকে গুলি চালানো হয়রাখাল বাবুদের বন্দুক ছিলোগুলি করিলে ওই লোকগুলা পিছায় গেলোআন্দাজ ১২টা-১টা পর্যন্ত  বিহারী আর বাঙালি মুসলমানরা ওই গ্রামে লুটপাট চালায়এরপর লুটেরারা চলি যায়সেদিন আমরা বয়স্করা মেয়েছেলেদের নিয়া বয়ারডাঙ্গায় বনের ভিতর আশ্রয় নিছিলাম

 

   পরদিন ৩ জ্যৈষ্ঠসেদিন বিকাল বেলা আমরা দেখলাম বয়ারডাঙ্গাতে ফকিরহাট এবং রামপাল এলাকার মানুষ আইসে ভরে গেলোএরা সব আমাগো স্বজাতি মানে হিন্দুবয়ারডাঙ্গা স্কুল মাঠ মানুষে মানুষে ভইরা গেলো৪ জ্যৈষ্ঠ আবার আমাগো উপর আক্রমণ হইলোকিছু লোক গুলি করতি করতি দেবীতলা-বয়ারডাঙ্গায় চলি আইলোসেদিন বোধহয় মিলিটারিও আইছিলো গানবোট নিয়াআমি অবশ্য তাদের দেখি নাইমিলিটারি আইছিলো বোধহয় ফুলতলার ওই দিক দিয়াসেদিন আমাগো সামনে দিয়া দৌড়াচ্ছিলো ফুলতলার একটা ছেলেতার নাম খোকন বিশ্বাসসে বলছে, আপনারা তাড়াতাড়ি সইরে পড়েন, মিলিটারি আইসে গেছেওরা লোক মারতেছেএটা শুনি অনেকেই দৌড় দিলোআমিও দৌড় দিছি

 

   আমার বাবা তখন বৃদ্ধতিনি প্যারালাইসিসের রোগী ছিলেনবিছানা থেকে উঠতি পারতেন নাসব সময় শুয়ে থাকতেনতেনারে আমাদেরই তুইলা খাওয়াতি হইতোআবার শোয়ায়ে রাখতি হইতোওই অবস্হায় বাবারে আমার দুই ভাই নৌকায় করি নিয়া যাচ্ছিলোতখন আমি বাড়িতে ছিলাম নাসে সময় আমাদের বাড়ির লাগোয়া একটা খাল ছিলোঐ খাল দিয়া একটা নৌকায় আমার দুই ভাই বাবারে নিয়া যাচ্ছিলোখালের মাঝখানি গেলি তারা দেখে একটা নৌকায়  কয়েকজন বন্দুক নিয়া আমাগোর দিকে আইসে পড়ছেতখন আমার দুই ভাই বাবাকে নৌকায় রাখি পানিতে ঝাঁপ দেয়তারা জলে ডুব দিয়া খালের পারে উঠি একটা বাগানের মধ্যে ঢুকি অন্য দিকে পালায় যায়আমার মেজ ভাইয়ের কোলে একটা ছোট বাচ্চা ছিলোতারপর বাবা একা নৌকায়নৌকা খালের পানিতে ভাসছেওই অবস্হায় বন্দুকধারীরা বাবারে গুলি করেঘটনা আমি পরে শুনিলাম

 

প্র: আপনি তখন কোথায় ছিলেন ?

 

উ: আমি সেদিন মাইলামারায় গেছিলামওখানে আমার বড় বোন তাদের পরিবার নিয়া চলি গেছেতাদের খোঁজ নেওয়ার জন্য আমি ওখানে গেছিলামতারা সব ইন্ডিয়া চলি যাচ্ছিলোআমার ভগ্নিপতির নাম মুকুন্দ মল্লিকতিনি বেশ ধনী লোক ছিলেনতাদের বাড়ি বাগনিওখান থেকে ফিরে আসার সময়ই তো শুনলাম আমাদের গ্রামে আক্রমণ হইছেপথে এক জায়গায় আমার বড় মেয়ে এবং দুই বৌদির সঙ্গেও দেখা হইলোবড় বৌদি বললো, তাড়াতাড়ি যাওআমাদের নৌকা ওদিকে আটকা পড়ে গেছেআমি তাড়াতাড়ি আমাদের গ্রামের দিকে রওনা হইলামআসার সময় দেখি বাদামতলায় আগুন জ্বলতেছেতখন আমি ওদিকে না গিয়া নদী সাঁতরাইয়া একটা চরে গেলামঐ চরের একটা বনে আশ্রয় নিছিলো অনেক মানুষওখানে আবার একজনের সঙ্গে আমার দেখা হইলোউনি আমার ধর্ম শ্বশুর হতেনতার নাম কার্তিক বিশ্বাসউনিই আমারে বললো যে, তোমার বাবাকে ওরা গুলি কইরা মাইরা ফেলছেসে আরো বললো, চরের সামনে দিয়া আমাদের বাড়িমুখী যে খাল, সেই খালে আমার বাবার লাশ ভাসতেছে

 

প্র: তারপর কি করলেন ?

 

উ: আমি তখন বাড়ির দিকেই গেলাম

 

প্র: তখন কি আক্রমণকারীরা ছিলো না ?

 

উ: না, ওরা গোলাগুলি কইরা চলি গেছেখালের পার দিয়া আমি বাড়ির কাছাকাছি যাইয়া দেখি বাবার লাশটানৌকা জলে ভাসতেছেআমি বাবার লাশটা খালের পারে নিয়া কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলামতারপর বললাম, আমরা তোমার অধম ছেলে, তোমাকে আমরা বাঁচাতি পারলাম না

 

প্র: এরপর আপনার বাবার লাশ সকারের ব্যবস্হা করেছিলেন কি ?

 

উ:কারের ব্যবস্হা করুম কি করে ! আমাগো লোক তো তখন সব ছত্রভঙ্গ হইয়া চলি গেছেআমি তখন একাআমার ভাইরা কে কোথায় জানি নাতখন বাবার লাশ ওখানে রাইখে সামনের দিকে গেলামযাওয়ার সময় একটা জাগায় ৪ জন আহত লোক দেখিলামতারা আমার পাশের বাড়ির লোকতাদের আমি কোনো সাহায্য করতি পারলাম নাএরপর আমি বাড়ি গেলামদেখি বাড়িতে আমাগো কেউ নাইবাড়িতে আইসে আমি আমার টাকা পয়সাগুলো বের করলাম

 

প্র: আপনার টাকা পয়সা কোথায় ছিলো ?

 

উ: মাটির গর্তেতখন তো আলমারি বা ট্রাঙ্কের মধ্যে থোয়া যায় নাডাকাত-টাকাতের ভয়ে আমরা টাকা লুকায়ে রাখতাম

 

প্র: কত টাকা ছিলো আপনার ?

 

উ: সে সময় ছিলো অনেক টাকা

 

প্র: সেদিন বাড়িতে এসে আপনাদের বাড়ির কি অবস্হা দেখলেন ?

 

উ: আমাগো বাড়ি যে অবস্হায় থুইয়া গেছিলাম সে অবস্হাতেই আছে

 

প্র: কোনো লুটপাট বা ক্ষতি হয়নি ?

 

উ: তখনও আমাগো বাড়িতে লুটপাট হয়নিআমরা একেবারে চলি যাওয়ার পর লোকজন আইসে লুটপাট করিছেআমি বাড়ি আইসে সেদিন আমার টাকা পাইছিদেখি জিনিসপত্রও কিছু নষ্ট হয়নিতবে আমাগো গরু বাছুরগুলা নাইসেগুলা তখন কোথায় আমি জানি নাকিছু মুসলমানকে দেখিলাম আমাগো গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থাকি গরু বাছুর নিয়া যাতিছেওদের কাছে কোনো অস্ত্র নাইতাদের কয়েকজনকে আমি দেখিলামওরাও আমাক দেখিলোতখন আমি ওদের কলাম, ভাই, আমরা তো কোনো ক্ষতি করি নাইতোমরা আমাকে কিছু বলো নাআমার ধান-চাল যা আছে তোমরা নিয়া যাওআমার গায়ে তোমরা হাত তুলো নাওরা কেউ আমাকে আর কিছু বলিলো নাএরপর আমি আবার রয়ারডাঙ্গা রওনা হইলাম

 

প্র: ঐ লোকগুলাকে আপনি চিনেছিলেন কি ?

 

উ: আমি ওদের কাউকে চিনি নাইওরা কেউ আমার এলাকার নাআর একদল লুটেরাদের আমি দেখিছিলামসেই দলের এক লোককে আমি জিজ্ঞেস করিছিলাম ভাই তোমাগো বাড়ি কই ? সে বলিলো আমাগো বাড়ি হচ্ছে ডুমুরের ভিতরওরা শরাবপুর, গজেন্দ্রপুরের লোকএখান থাকি শরাবপুর-গজেন্দ্রপুর অনেক দূরওই জাগার লোকও এখানে লুট করতে আইছিলোগজেন্দ্রপুরে এক মুসলমান ফকির ছিলোতারে আমরা পাগলা ফকির কতামঐ ফকিরের কাছে আমরাও যাতামতার এক ছেলের নাম জাহাঙ্গীরতারে আমি চিনতামসেদিন জাহাঙ্গীররে আমাগো এলাকায় আমি নিজে দেখছিজাহাঙ্গীর বন্দুক নিয়া তার বন্ধুদের নিয়া আসছিলো

 

   যাহোক, আমি বাড়ি থাকি চলি যাচ্ছিযাওয়ার সময় নদীর পাশেই দেখি যে আমাগো গ্রামের একজন খালের ধারে পড়ি আছেতার নাম হচ্ছে কুঞ্জআমি তার কাছে গেলি পর সে আমাকে বলিলো, ভাই, আমার পিঠের মধ্যে গুলি লাগিছে, আমার কাছে টাকা আছে; তুমি আমার সব টাকা নেও আর আমারে বাঁচাওআমি তারে বলিলাম টাকা আমি কি করিবোআমার নিজেরই অনেক টাকা আছেএই কথা কয়ে সামনে আগোয় দেখি তার এক বোন যাচ্ছেতার বোনকে আমি কলাম, তোমার ভাই আহত অবস্হায় পড়ি আছেতখন তার বোন খুব কান্নাকাটি করি বলিলো, দাদা, আমার ভাইরে একটু বাড়ি পর্যন- আইনে দেনতখন আমি কি করুম ! আমি আর তার বোন মিলি ধরাধরি করি কুঞ্জরে নিয়া আইলামতারপর আমি আবার আমাগো বাড়ির দিকে গেলামএবার বাড়ি যাইয়া দেখি নগেন বাবুর মা আমাগো বাড়ির ভিতরআমি বাড়িতে গেলে উনি আমার জড়ায় ধরিছেআমি তারে কলাম তুমি বসো, আমি একটু আমার মারে তালাশ করিনগেন বাবুর মারে দেখি তখন আমার মার কথা মনে পড়িলো

 

প্র: আপনার মা কোথায় ছিলো ?

 

উ: সে তো হারায়ে গেছেমারে আমি খুঁজে পাতিছি নাআমাদের কে যে কোথায় আমি কিছুই জানি নাআমরা তো সব দিশেহারাএরপর আমি একটা বাড়িতে গেলামসেই বাড়িতে ঢোকার আগেই একটা গোঙানির শব্দ পাইলামআমি বাড়ির ভিতরে  ঢুকলামতারপর দেখি যে, একটা ঘরের পিছনে আমাগো বাড়ির পাশের নিতাই মন্ডল আহত অবস্হায় গোঙাচ্ছেতার চারদিকে রক্তআমাকে দেখি উনি কয়, বাবা, আমি একটু জল খাবোকি করি, তখন আমি তারে জল খাওয়ালামতারপর আমি আবার আমার মার তালাশ করতি লাগলামতালাশ করতি করতি ৪টা/৫টা বাইজে গেলোকোথাও মারে পালাম নাআমার ভাই, তাদের স্ত্রী-ছেলেমেয়েদেরও খোঁজ নাইআমার স্ত্রী এবং মেয়েরও খোঁজ নাইতখন ভাবিলাম এখানে থাকা ঠিক নাকি জানি কখন কি বিপদ হয়এরপর আমি মাইলামারা বান্ধের দিকে চলি গেলামওখানে যাওয়ার পর আমাগো বাড়ির লোকজনের কিছু দেখা পালাম

 

প্র: মাইলামারা গিয়ে কাকে কাকে পেলেন ?

 

উ: মাইলামারায় আমার দুই ভাইরে পালামতারপর আমার বড় বোনরে পালামআমার বোন আগে থাকিই ওখানে ছিলোবহু লোক ওখানেতারা সবাই ভারতে যাবেকেউ খালি হাতেকেউ কিছু জিনিসপত্র নিয়া আইছেআমরাও ভারতে যাবোআমরা তো কিছু নিতি পারি নাইআমি শুধু আমার টাকাটা নিছিআমার বোন কিছু জিনিস নিয়া আইছেআমার ভাইয়েরাও কিছু নিতি পারে নাইওখানে ভাইদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর একটা বড় নৌকা ঠিক করিলাম ডুমুরিয়া যাওয়ার জন্যপরদিন আমরা ডুমুরিয়া রওনা হইলামজোয়ার আইলে আমরা নৌকা ছাড়ি দিলামডুমুরিয়া বাজারে যখন পৌঁছি তখন রাত ৮টার মতোবাজারে লোক ভর্তিতারা সব বিভিন্ন এলাকার লোক

 

প্র: আপনার স্ত্রী, মেয়ে এবং মাকে তখন পেয়েছিলেন কি ? আপনার ভাইদের স্ত্রী সন্তানদের ?

 

উ: তাগো তখনো পাইনিতারপর তো ডুমুরিয়া বাজারে গেলামডুমুরিয়া বাজারে অনেকক্ষণ তালাশ করিও তাদের পালাম নাতখন রাত হয়া গেছে