নাম : হৃষিকেশ দাস

পিতা : মৃত রমানাথ দাস

গ্রাম : রঞ্জিতপুর

ইউনিয়ন : খানপুর, ডাক : খানপুর,

জেলা : বাগেরহাট (৭১-এ খুলনা জেলার অন্তর্গত মহকুমা)

শিক্ষাগত যোগ্যতা : বি. এ. বি. এড.

১৯৭১ সালে বয়স : ২৫-২৬

১৯৭১ সালে পেশা : শিক্ষকতা

বর্তমান পেশা : শিক্ষকতা

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন  ?

 

উ: তখন তো রাজনীতি সম্পর্কে এতো গভীরভাবে চিন্তা করতাম নাতবুও যতটুকু মনে পড়ে নির্বাচনের পরে বাঙালিদের মধ্যে একটা চেতনা জেগেছিলোবাঙালিরা ভাবতে শুরু করেছিলো যে তারা তাদের অধিকার ফিরে পেতে যাচ্ছেআমরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলামআমাদের অধিকারের প্রশ্নে নির্বাচন হয়েছে-আমরা জয়লাভ করেছিআমরা আমাদের অধিকার বুঝে পাবো এইটেই ভাবতামআমরা চিন্তা করতাম যে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছি; সুতরাং আমাদেরকে তারা ক্ষমতায় যেতে দেবেঅনেকে বলছিলেন আমাদেরকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া তাদের উচিততারা যে আমাদের ক্ষমতায় যেতে দেবে না বা একটা সিভিল ওয়ার শুরু হবে, স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের উপর চেপে বসবে, এটা সেই সময় কিন্তু আমার ধারণায় ছিলো নাতখন অনেক ঘটনায় আমাদের এখানে ঘটছিলোএকের পর এক ঘটনা দেখে মনে হচ্ছিলো যে এ সব ঘটনা বড় সংঘর্ষে রূপ নেবেহয়তো অনেক লোক মরবেঅনেক সমস্যা দেখা দেবেধীরে ধীরে সংঘর্ষের মধ্যে আমাদের জড়িয়ে পড়তে হবেকিন্তু ঠিক তখনই যে স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করবো, স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের চালিয়ে যেতে হবে-এটা তখনও কিন্তু আমি ভাবি নাইভাবতাম যে, হয়তো আলোচনায় সমাধান হলেও হতে পারেকিন্তু Solution কি হবে, এর সমাধান কেমন হবে, আমরা কোথায় চলে যাচ্ছি এবং কি হবে পরিণতি-তখন এ সব কিন্তু আমরা বুঝতে পারি নাই, কেউ এ সব ভেবেছেন বলেও মনে হয় না

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আপনার কি মনে হয়েছিলো ?

 

উ: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের পরই মনে হলো দেশ স্বাধীন হতে চলেছেস্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ আমাদের অনিবার্য হয়ে পড়েছেদেশ মুক্তির জন্য আমাদের লড়াই করতে হবেদেশ যতোদিন পর্যন্ত স্বাধীন না হবে ততোদিন পর্যন্ত আমাদের এ যুদ্ধ চালাতে হবেযুদ্ধ ছাড়া এখন এ সমস্যার আর কোনো সমাধান হতে পারে নাআমরা খুবই উজ্জীবিত ছিলাম

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আপনার এলাকার মানুষের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: আমি যে এলাকায় থাকতাম সেটা হিন্দু এলাকাওখানে একটা হাইস্কুলের কাছে কয়েকটা দোকান আছেকোনো বড় হাট বাজার নাইগ্রামের অধিকাংশ মানুষ সকাল-সন্ধ্যায় ওখানে আসতোগ্রামের অধিকাংশ মানুষই ছিলো অশিক্ষিতকিছু মানুষ সামান্য লেখাপড়া জানতোসংবাদপত্র বড় একটা গ্রামে আসতো নাআজও খুব কম যায়তখন রেডিও সংবাদের মাধ্যমে অনেক কিছু শুনতাম এবং যার যা চিন্তা ধারা সেই অনুসারে সে সংবাদের ব্যাখ্যা করতোকেউ বলতো, এই যে শেখ মুজিব আরম্ভ করেছে তাতে হয়তো দেশটা একদিন গারদ হয়ে যাবেআমাদেরকে এক সময় এ্যারেস্ট হতে হবেআমাদেরকে গুলি করে মারবে এবং গুলি করে মারছেওআবার কেউ বলতো অতোটা সহজ না, বললেই হলোগ্রামের মানুষ যেভাবে আলাপ করে সেইভাবেই আলাপ আলোচনা করতোকিন্তু আমরা যারা কিছুটা লেখাপড়া জানতাম, আমরা তাদেরকে প্রকৃত পরিস্হিতি বুঝাতামনিজেরা বসে খন্ড খন্ড আলোচনাও করতামতারপর তো স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো

 

   আমরা তখন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জন্য ডাব, নারকেল বা খাদ্য-টাদ্য নিয়ে খুলনায় দিতামআমি ছিলাম, আমার সঙ্গে ছিলো শহীদ আখতারউজ্জমান পিরুতার বাড়ি সুগন্ধী, রাখালগাছি ইউনিয়ন, সুগন্ধী গ্রামতার মা এখনও জীবিতছেলেটার বয়স আমাদের থেকে একটু কম ছিলোতার উসাহ খুব বেশি ছিলোসেই আমাকে উদ্বুদ্ধ করতোআমার এলাকার মানুষকেও করতোযে গ্রামে আমার জন্ম  সেখানে এসে বলতো ভয় নেই’, আমরা আছিআমাদের অস্ত্র আছেসে বলতো স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছেআমাদের প্রত্যেককে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবেতখনও কিন্তু আমি স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি নাইএটা মার্চ মাসের শেষের দিকের ঘটনাতখন আখতারউজ্জামান পিরুই আমাদের গ্রামে বেশি আসতোএকটা সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবী পরে সে আসতোতার মাধ্যমেই আমরা খুলনার এদিক ওদিক চলাফেরা করতামতার কাছ থেকেই শুনতাম সব কথাকথা শুনে তখন রক্ত গরম হয়ে উঠতোআরো দুএকটা ছেলে আসতোতাদের নাম আমার ঠিক মনে পড়ছে না

 

   মনে মনে ভেবেছি পশ্চিমারা যতোই এ দেশটা দখল করার চেষ্টা করুক, যতোই ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করুক এক সময় না এক সময় তারা তা পারবে না, ইতিহাস তা বলে নাতখন আমি শিক্ষকতা  করছিআমি মানুষজনকে বলতাম যে, ইতিহাস বলে কোনো দেশে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় তখন স্বাধীনতা যুদ্ধকে দাবায়ে রাখা যায় নাএ সময় গ্রামের কিছু কিছু মানুষ ভাবতো যে যুদ্ধটা তাদের উপর চাপায়ে দেয়া হচ্ছেযুদ্ধটা চালানো ঠিক হচ্ছে নাআর যারা ইয়াং ছেলেপেলে ছিলো আমাদের মতো, তারা বলতো ঠিক কাজই হচ্ছেআমরা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরও তারা অন্যায়ভাবে আমাদের পরে জুলুম চালাচ্ছেসুতরাং যুদ্ধ ছাড়া আমাদের দ্বিতীয় কোনো পথ নাইযখন বাংলার অসি-ত্ব তারা অস্বীকার করছে তখন আমাদের অস্তিত্ব আমাদেরকেই টিকায়ে রাখতে হবেআমরা যারা ইয়াং ছেলেপেলে ছিলাম, শিক্ষিত ছেলেপেলে ছিলাম, স্কুল-কলেজ, ভার্সিটিতে যারা পড়তো-তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতোআর অধিকাংশ বুড়োরা ঝুট ঝঞ্জাট-টাকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতোতারা বলতো যে, পাকিস্তানিরা যা বলছে-সেটা মেনে চললেইবা কি অসুবিধা ছিলোআমরা তো ঝামেলার হাত থেকে বেঁচে যেতামএতো খুন-খারাবি তো হতো নাএই শ্রেণী বা গ্রুপ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলোকিন্তু আমরা যারা যুবক ছেলেপেলে ছিলাম আমরা উসাহিত হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়তে চাইতাম

 

প্র: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন-সেই বক্তৃতা সম্পর্কে আপনি কি জানেন বা কি শুনেছেন ?

 

উ: বক্তৃতাটা আমাদের জীবনে একটা চরম সত্যের সন্ধান দেয়ঐ বক্তৃতা আমাদের জীবনের উপর দারুণ প্রভাব ফেলেছিলোভাষণের পর আমাদের সংগঠনটা আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠেঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেন যে, আজকের এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, আজকের এ সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামতোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবেএই কথাগুলো মানুষের মধ্যে ভীষণ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলোএই বক্তৃতার পর থেকেই আমরা রাইফেল যোগাড় করার চেষ্টা করিআমরা ঐ দিনই বুঝেছিলাম যে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ আমাদের খোলা নেইপরদিন থেকেই এখানে একটা বাহিনী গঠন করা হলো বুড়োদের নেতৃত্বেএই বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বর্গীয় মনীন্দ্র দাস, স্বর্গীয় ডা: ননী গোপাল দাস, শুকলাল দাস, নগেনবাবু, কালিপদ বাবু প্রমুখআরো ছিলোতবে সামনের সারিতে এরা ছিলেনএই বাহিনী পরে মুক্তিবাহিনী হিসাবে কাজ করেএই বাহিনীর সঙ্গে আমি ছিলামআমার সঙ্গে ছিলেন শহীদ সনাতন দাসতিনি যুদ্ধে শহীদ হন

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আপনারা রাইফেল এবং অন্যান্য অস্ত্র কিভাবে সংগ্রহ করলেন ?

 

উ: ৭ মার্চের মিটিংয়ের পর আমরা তপর হয়ে উঠিআমাদের গ্রামে তখন তো আজকের মতো অস্ত্র ছিলো নাআমাদের তখন রামদা, বড় বড় দা, সড়কি, বিভিন্ন রকম গুলটি, গুরোল বাঁশ, কাঠি-এ সমস্তই বেশি ছিলো, এগুলোই মানুষ ব্যবহার করতোকিন্তু ওতে তো পাক সেনাদের ঠেকানো যাবে নাতাই অস্ত্র যোগাড় করবার জন্য আমরা চেষ্টা চালাতে লাগলামআমি এবং আমার সঙ্গে ছিলো তকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক হাওলাদারের ছেলে ছাত্তাররাজ্জাক সাহেব তখন আওয়ামী লীগার ছিলেনউনি তখন আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিলেনছাত্তার আর আমি বাগেরহাট গেলামবাগেরহাটে নরেন্দ্র নারায়ণ বস্ত্রালয় বলে একটা দোকান ছিলোএখন ওটা নাইঐ বিলডিংয়ে তখন বাগেরহাট মহকুমা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি অজিয়ার রহমান থাকতেনতাঁর কাছ থেকেই আমরা রাইফেল গোলাবারুদ সংগ্রহ করলামএই প্রথম অস্ত্র পেলাম  কোথা থেকে এই অস্ত্র তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তা জানিনাএর আগে আমার কাছে কোনো রাইফেল বা অন্য অস্ত্র ছিলো নাআমি তখন রাইফেল ছুঁড়তে পারতাম নাএকজন ইপিআর সদস্য মতিউর রহমান সে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলোঅস্ত্রপাতি নিয়ে আমরা একটা রিক্সায় সবার সামনে দিয়েই চলে আসলামকিন্তু আমাদের কেউ কিছু বললো নাসবাই দেখলো যে আমরা রাইফেল নিয়ে যাচ্ছি, কেউ তখন বাধা তো দিলোই না বরং সবাই আমাদেরকে উসাহিত করলোআমরা ভুটেমারী খেওয়া পার হয়ে সায়েড়া স্কুলের কাছ পর্যন্ত আসলামসায়েড়া স্কুলের কাছে বটতলায় আসলে আমাদের কাছ থেকে গুলির প্যাকেটটা পড়ে গেলোবড় একটা মোটা কাগজের প্যাকেটকাগজের প্যাকেটটা পড়ে রাইফেলের কার্তুজগুলো ছড়ায়ে গেলোবটতলায় তখন একটা দোকান ঘর ছিলো বলে মনে পড়ছেরাইফেলের কার্টিজগুলো তাড়াতাড়ি মাটি থেকে উঠোলামতারপর আমরা সায়েড়া স্কুলের পাশ দিয়ে আরো শামনে অগ্রসর হয়ে ডান দিকে মুসলমান পাড়ার ভিতর দিয়ে সাঁকো পার হয়ে এপারে যখন চলে আসি তখন ছাত্তার চলে গেলোআমরা রঞ্জিতপুরে অস্ত্র নিয়ে এলামএর আগে কোনো অস্ত্র আসেনি

 

প্র: আপনি অস্ত্রগুলো নিয়ে কি করলেন ?

 

উ: অস্ত্রগুলো আনবার পর এলাকার মানুষের মধ্যে একটা বল আসলো, যুবক ছেলেপেলেরা যারা আমার সঙ্গে ছিলো তারাও খুব উসাহিত বোধ করলোরঞ্জিতপুরে ঢোকার সাতটা পথ ছিলোসাতটা পথে সাতটা ঘাঁটি তৈরি করা হলোসাতটা ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনী নিয়োগ করা হলোমূল ঘাঁটি ছিলো রঞ্জিতপুর হাইস্কুলেওখানে দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টাই অস্ত্র নিয়ে আমরা কেউ না কেউ থাকতামসন্ধ্যার পর থেকে ঘাঁটিগুলোকে জোরদার করা হতো

 

   এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপক লুটতরাজের সংবাদ আসতে লাগলোতখন অনেক হিন্দু ঘরের মেয়েরা, পুরুষ ছেলেরা ভয়ে রঞ্জিতপুরে এসে আশ্রয় নিতে লাগলোতখনই বাইরে প্রচার হয়ে গেলো যে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রঞ্জিতপুরে ঘাঁটি  স্হাপিত হয়েছে এবং সেখানে পাক মিলিটারী ঢুকতেও সাহস পাবে নাঅনেক অস্ত্রশস্ত্রের মালিকও নাকি আমরা হয়েছিআসলে বেশি অস্ত্রশস্ত্রের মালিক আমরা তখন ছিলাম নাঐ সময় বেশ কয়েকজন ধনী লোকও আমাদের এখানে আশ্রয় নিয়েছিলোনরেন্দ্র নারায়ণ বস্ত্রালয়ের মালিক, একটা ব্যাংকের ম্যানেজার কৃষ্ণপদ বাবুসহ অনেকে টাকা পয়সা, সোনাদানা নিয়ে রঞ্জিতপুরে আশ্রয় নিয়েছিলোআমরা অস্ত্র নিয়ে তখন পাহারা দিতামকখনও কখনও ফাঁকা গুলি করতামআমাদের একটা running party ছিলো, তারা বিভিন্ন ঘাঁটি ঘুরে সব তদারকি করতোকোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে এ সব খবর নিতো

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছিলেন ? কখন, কিভাবে শুনেছিলেন এবং তখন আপনি কি করলেন  ? যুদ্ধের দিনগুলির কথা বলবেন কি ?

 

উ: এই ঘটনা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে শোনাকেউ এক জায়গা থেকে শুনে আসছে, সে আইসে বলছেলোকের কাছ থেকেই আমরা শুনছিখবর শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলামশুনলাম তারা বহু মানুষ খুন করছেতখন মনে মনে পণ করলাম যে ওদেরকেও আমরা হত্যা করবোযেখানে পাবো সেখানেই হত্যা করবোতাদ