নাম : এস. এম. ইউসুফ আলী

পিতা :ন্তাজউদ্দীন শেখ

বর্তমান ঠিকানা : জেলা ফুড অফিস, খুলনা

স্হায়ী ঠিকানা : গ্রাম : কলাখালি,

ইউনিয়ন :   ?, 

ডাক :  ?

থানা : নাজিরপুর,

জেলা : পিরোজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৭

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : চাকরি

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর হাতে আপনি কি আক্রান্ত হয়েছিলেন ?

 

উ: নাআমি সরাসরি আক্রান্ত হইনি

 

প্র: আপনি কি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁআমি বাগেরহাট এলাকায় যুদ্ধ করেছি

 

প্র: আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন ?

 

: সেটা বলার আগে আর একটা কথা বলতে হয়আমার পৈত্রিক বাড়ি খুলনায় নাচাকরি সূত্রে বর্তমানে এখানে বসবাস করছিআমার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার কলাখালিসেই সময় আমি কলাখালি ছিলামওখান থেকে আমি ইন্ডিয়া গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেইআমি ইন্ডিয়ার বিহারে ট্রেনিং নিয়েছিআমরা কয়েকজন একত্রে ইন্ডিয়া যাইপ্রথম বার রওনা দিয়ে আমরা ইন্ডিয়াতে যেতে পারিনিপরে আবার রওনা দেইসে যাত্রায় আমরা সফল হইইন্ডিয়া যাবার পথে আমরা বেশ বাধার সম্মুখীন হয়েছিআমরা যাওয়ার পথে মারাও যেতে পারতামপ্রথমবার আমরা প্রায় দশ পনরো জন ভারত রওনা হইপথিমধ্যে কতদূর গিয়ে জানতে পারলাম,যে পথে আমরা নৌকা যোগে যাচ্ছি সে পথে সামনে রাজাকারদের একটা ক্যাম্প আছেলোক মারফত এ খবর পেয়ে আমরা ওদিকে গেলাম নাসেই যাত্রায় আমাদের ভারত যাওয়া হলো নাআমরা আবার গ্রামে ব্যাক করলামফিরে আসার পর আমরা অতি উৎসাহী পাঁচ জন চিন্তা করলাম যে,আমাদের যেতেই হবে,যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেই হবেআমরা পাঁচ জন আবার একদিন রওনা হলামবরিশালে বিখ্যাত পেয়ারা বাগান আছে,এবার আমরা কলাখালি থেকে সেখানে গেলামওই এলাকায় তখন অনেক শরণার্থী ছিলোশরণার্থীরা ওখান থেকে একটা পথ দিয়ে ইন্ডিয়া যেতোসেই পথে আমরাও শরণার্থী সেজে এক নৌকায় ওখান থেকে রওনা হলামনৌকা দুই দিন চলার পর এক জায়গায় সেটা ছেড়ে দেয়া হলোএরপর আমরা শরণার্থীদের সাথে হাঁটা পথে রওনা হলামএক পর্যায়ে আমরা তাদের কাছ থেকে কখন দলছুট হয়ে গেছি জানি নাআমাদের সঙ্গের আর দুজনও আমাদের সঙ্গে নাইশরণার্থীদের দল আমাদের তিনজনকে রেখে চলে গেছেশরণার্থীরা কোন দিকে গেছে জানি নাআমরা তিনজন তখন একত্রেশরণার্থীদের না পেয়ে আমরা তিনজন দ্রুত সামনে যেতে থাকলামএদিকে সন্ধ্যা হয়ে এলো আমরা তখন পথে একটা বাজার পেলাম

   

আমরা তখন খুব ক্লান্তমাইলের পর মাইল পথ হেঁটে এসেছিখুব ক্ষুধাও লেগেছেভাবলাম এই বাজার থেকে কিছু কিনে খাইসেই মনে করে আমরা ঐ বাজারে গেলামআমার এখনও মনে আছে,সেই জায়গার নাম বাথানগাছিওটা যশোর না মাগুরায় তা জানি নাবাথানগাছি নামক একটা বাজারে আমরা গেলামওখানে একটা ঔষধের দোকান থেকে এক লোক আমাদের ডাক দিলেনউনি জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কারাআমরা বললাম যে, আমরা শরণার্থীউনি বললো যে,আপনারা শরণার্থী নাআপনারা মুক্তিবাহিনীতে যাবেন,তাই না ? আমি আওয়ামী লীগেরই লোকআমি মুক্তিবাহিনীরও লোক,আপনারা আমার ওখানে থাকতে পারেনমাইলের পর মাইল পথ হেঁটে আমরা সবাই ক্লান্ততার কথায় আমরা সবাই রাজি হয়ে গেলামতাকে আমরা বিশ্বাস করলামআমাদের বয়স তো তখন কমআমরা মনে করলাম যে,হতেও পারেআমরা বললাম,ঠিক আছে আমরা চিড়া গুড় কিনা নিয়া আসিযখন ওখান থেকে বের হয়ে চিড়া গুড় কিনতে গেছি তখন আর একজন লোক আমাদের ডাকলেনলোকটা বেশ বৃদ্ধউনি আমাদের কাছে একটু এগিয়ে এসে বললেন,বাবারা ঐ লোক তোমাদের কি বললোবললাম যে, উনি আমাদের থাকার ব্যবস্হা করে দেবেন বললেনতখন ঐ বৃদ্ধ বললেন,খবরদার! ঐ কাজটি করো নাউনি কিন্তু পিস কমিটির একজন মেম্বারতার কথা শুনলে তোমরা কিন্তু নির্ঘাত মারা পড়বাতখন আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলামমনে মনে ভাবলাম এখন এখান থেকে আমরা কোথায় যাই ? তখন তাকে বললাম যে,আমরা একটা শরণার্থী দলের সঙ্গে ভারতে যাচ্ছিলামতাদের থেকে আমরা দলছুট হয়ে পড়েছিতখন উনি আমাদের বললেন যে, তোমরা এক কাজ করো,এখান থেকে কোয়ার্টার মাইল দূরে একটা হাইস্কুল আছে,ওখানে শরণার্থীরা হয়তো থাকতে পারেতোমরা তাড়াতাড়ি ওখানে যাওওখানে গেলে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে নাআমরা সেই বৃদ্ধের কথামতো সেখানে গেলামওটা বাথানগাছি হাই স্কুলস্কুলের নামটাও আমার মনে আছেসেখানে আমরা গেলাম মনে হয় হাফ দৌড়েদৌড় দিলে কেউ হয়তো সন্দেহ করবেনা দৌড় না হাঁটাঐ ভাবে হেঁটে আমরা সন্ধ্যার পর ওখানে পৌছলামদেখি যে ওখানে অনেক শরণার্থীকেউ কেউ মাটিতে আলগা চুলা বানিয়ে রান্না বান্নার ব্যবস্হা করছেআমরা ওখানে একটা শরণার্থী ফ্যামিলির কাছে বসে পড়লামতারা একটা বড় কাঁথা ওখানে বিছিয়ে বসে ছিলোআমরা ঐ কাঁথার উপরই বসে পড়লামওই পরিবার ডাল এবং চাউল দিয়ে খিচুড়ি পাক করছিলোআমরা তিন বন্ধুও ওখানেতারা পাক করেই প্রথম খাবারটা আমাদের দিকে আগায়ে দিলোতারা বললো তোমরা একটু খাও,আমরা পরে খাবোযে মহিলা আমাদের খাবার দিলেন তার আন্তরিকতা আজও আমি ভুলতে পারিনিতিনি আমার মার মতোই আমাদের স্নেহ করেছিলেনওই মহিলার সেই দিনের আন্তরিকতা আজও আমাকে নাড়া দেয়তার পরিচয় আমাদের জানা হয়নি

   

যাহোক,ওখানে রাত্রি যাপন করার পরে শরণার্থীদের সঙ্গে আমরা ইন্ডিয়া গেলামইন্ডিয়া যাওয়ার পরে আমরা একটা ক্যাম্পে থাকলামসেখান থেকে আমাদের ট্রেনিংয়ে পাঠালোবীরভূমে প্রথম আমাদের গেরিলা ট্রেনিং দিলোঐ ট্রেনিং শেষ হবার পর হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য গেলাম বাকুন্দিয়ায়ওখানে আমরা ২১ দিন ট্রেনিং নিলামআমাদের ট্রেনিং চলার সময় সেখানে একদিন সুন্দরবন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দীন সাহেব এলেনতিনি এসে বললেন যে,এখানে আমাদের অঞ্চলের যে সব ছেলেপেলে আছে তাদেরকে আমি নিয়ে যাবোতখন উনার সঙ্গে আমরা রওনা হলামআমরা বোধহয় ২৭/২৮ জন ছিলামতিনটা নৌকায় আমরা রওনা হলামএটা বোধহয় অগাস্ট মাসের শেষ দিকের কথামাঝ রাত্রের দিকে তখন একটু কুয়াশা পড়েআমাদের নৌকা চলছে নি:শব্দেবৈঠার শব্দ খুবই কমকথা ছিলো যে, কোনো শব্দ করা যাবে নালাইট জ্বালানো যাবে নাসুবেদার লতিফ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ২৭/২৮ জন তিনটা নৌকায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সুন্দরবনের দিকে যাচ্ছিভোর রাত্রের দিকে আমরা একটা নদীর মোহনা পার হচ্ছিলামজায়গাটার নাম আমি জানি নাওখানে আগে থেকেই একটা পাকিস্তানি গানবোট ছিলোকুয়াশার কারণে সেটা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় নাইগানবোটেও কোনো আলো ছিলো নাআমাদেরও কোনো আলো নাইকুয়াশার কারণে হয়তো ওদেরও দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিলোযার জন্য তারাও আমাদেরকে দেখতে পায়নিএক দম কাছে যাওয়ার পর হঠাৎ সেই গানবোটটা আমাদের নজরে পড়লোআমাদের নৌকাগুলো গান বোটের খুব কাছাকাছিগানবোট থেকে ফায়ার করলে আমাদের তিনটা নৌকাই ধ্বংস হয়ে যাবেহঠাৎ গানবোট দেখে আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলামতখন মাঝিরা শুধু নৌকা চালাচ্ছিলোগানবোট দেখে আমরা কয়েকজন বৈঠা বাওয়া শুরু করে দিলামখুব দ্রুত আমাদের নৌকা চলছেমনে হয় যেন স্পীড বোটদ্রুত পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প ছিলো নাযদি পাকিস্তানি গানবোট টের পেয়ে যায় তা হলে তারা আমাদের আক্রমণ করবেআমাদের এমন কোনো অস্ত্র নাই যা দিয়ে গানবোটকে ঠেকাতে পারিতখন আমাদের কাছে অল্প কিছু হালকা অস্ত্রশস্ত্র ছিলোওগুলো দিয়ে গানবোট ঠেকানো যায় নাআমরা দোয়া দরুদ পড়ছি আর বৈঠা ঠেলছিআধ ঘন্টা পর গানবোটটা ওরা স্টার্ট দিলোতখন আমরা আরো ভয় পেয়ে গেলামসুন্দরবনের ঐ এলাকায় নদীতে বিভিন্ন স্হানে আড়াল টাড়াল পাওয়া যায়কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে,আমরা সেটাও পাচ্ছিলাম নাদেখি ওরা গানবোট র্স্টাট দিয়ে অন্য দিকে চলে গেলোআমাদের আর দেখতে পায় নাইঘন্টাখানেক পর আমরা জঙ্গলের আড়ালে খাল দেখতে পেলামওখানে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা পরে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হলাম

   

মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের একটা আউটার চেকপোস্ট ছিলো ক্যাম্প থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরেআমরা রাত্রে সেটা অতিক্রম করতেছিলামওখানে যারা ডিউটিতে ছিলো তাদের বোধহয় নলেজে ছিলো না যে,মুক্তিবাহিনীর নতুন গ্রুপ ইন্ডিয়া থেকে তাদের ক্যাম্পে আসতেছেতারা আমাদেরকে হল্ট করাইছেআমরাও ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া ভাবছি যে, এরা হয়তো রাজাকারআমাদের সুবেদার সাহেব বললেন যে,তোমরা পজিশন নেওআমরা তখন মুখোমুখি অবস্হানেকিন্তু কোনো পক্ষই গুলি করছি নাতারপরে কথাবার্তার মাধ্যমে আমাদের পরিচয় হলোপাস ওয়ার্ড বিনিময় হলোতখন তারা আমাদের ছেড়ে দিলোতারপরে সেখান থেকে আমরা ভিতরে ঢুকলামআমরা অবস্হান করলাম সুন্দরবনের বগী ক্যাম্পেসেটা ছিলো ফরেস্টের একটা অফিসওখানে মুক্তিবাহিনীর আউটার ক্যাম্প ছিলোওখান থেকে মাইল দেড়েক ভিতরে ছিলো মেইন ক্যাম্পএটা বাগেরহাট জেলায়আমি বাগেরহাট জেলাতেই যুদ্ধ করেছিআমরা ওখানে যাওয়ার একদিন পর ওখানকার মুক্তিবাহিনী রায়েন্দা এবং শরণখোলায় আক্রমণ করেওখানে যুদ্ধ শুরু হলোএকজন কমান্ডার আমাদেরকে ডেকে বললো,ওখানে যুদ্ধ চলছে,তোমরা কে কে ওখানে যেতে চাওআমরা যে তিন জন একত্রে ভারতে গিয়েছিলাম তারা বললাম যে,আমরা যাবোগ্রুপ কমান্ডার বাদল ভাইয়ের সঙ্গে আমরা ওখানে যুদ্ধ করতে গেলামধান খেতের ভিতর দিয়ে কিছুদূর গিয়ে ক্রলিং করে বাজারের পাশে আমরা পজিশন নিলামআমরা কয়েকটা গ্রুপে বিভক্ত ছিলামওখানে যুদ্ধে আমাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়তাদের একজনের নাম আসাদযুদ্ধ শেষ হবার পর আমরা ওই জায়গাটার নাম আসাদ নগর নামকরণ করে এসেছিলামকিন্তু সেই নামকরণ পরে কার্যকর হয় নাই

   

যা হোক,ওখানে গিয়ে আমরা প্রথম এক দিন এক রাত্রি যুদ্ধ করিপরে ব্যাক করে পিছিয়ে যাইআবার এসে আমরা যুদ্ধ করিএভাবে ৬/৭ দিন ওখানে যুদ্ধ হয়ওখানে রাজাকার এবং পাঞ্জাবি পুলিশ ছিলোথানার ওসি ছিলো বাঙালিওরা বাংকারে পজিশন নিয়ে ছিলোওদের সঙ্গে আমরা পারছিলাম নাআমরা তখন ক্ষুধায় কাতরসামনে রায়েন্দা বাজারআমাদের পজিশন ছিলো এপারে,বাজারের কাছেআমরা কয়েকজন তখন ঐ বাজারে গিয়ে একটা দোকান খুলে দেখি সেটা মিষ্টির দোকানদোকানের ভিতর একজন লোকও ছিলোআমরা দেখলাম দোকানে শুকনা মিষ্টি আছেওটাকে দানাদার বলে,চিনি দিয়ে তৈরিআমরা গোগ্রাসে ওগুলা গিললামদুই দিন ধরে আমরা না খাওয়াওগুলো খেয়ে আমরা শরীরে একটু শক্তি পেলামপরে ওখান থেকে আমরা আবার যুদ্ধ ফিল্ডে গেলাম৩/৪ দিন পর কমান্ডার আমাদের আবার ব্যাক করার নির্দেশ দিলোতখন আমরা পিছনে ব্যাক করে এক জায়গায় সেল্টার নিলামওখানে যেয়ে আর একটা ঘটনা ঘটলোদেখি কোথা থেকে একটা বাচ্চা ছেলে আমাদের কাছে আসছেসম্ভবত সাত আট বছর বয়স হবে তারসে কতগুলি মুড়ির মোয়া নিয়া আসছেও বলতেছে যে, আপনারা এই মোয়াগুলি খানআমার মা পাঠাইছে আপনাদের জন্যতখন সত্যি আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছিতার মা মোয়া পাঠাইছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যমুড়ির মোয়া আমরা খাইলামওখানে ৬/৭ দিন যুদ্ধের পর পাঞ্জাবি পুলিশ এবং রাজাকার,আল-বদররা পরাজিত হয়ওখানে আমাদের হাতে অনেক রাজাকার এবং আল-বদর ধরা পড়েকয়েকটা পাঞ্জাবি পুলিশও ধরা পড়ে

 

প্র: বাগেরহাটে পাক বাহিনী কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: আমি তো আগেই বলেছি আমার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার কলাখালিআমি তখন সেখানে ছিলামকি&