নাম
:
শচীন চন্দ্র
রায়
পিতা
:
নিশি কান্ত
রায়
গ্রাম
:
খজাপুর, ইউনিয়ন : এলুয়ারি, ডাক : খজাপুর
থানা
:
ফুলবাড়ি, জেলা : দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : তৃতীয়
শ্রেণী পর্যন্ত
১৯৭১
সালে বয়স : ১৯/২০
১৯৭১
সালে পেশা : বেকার
বর্তমান
পেশা : কৃষিকাজ
প্র:
পাকিস্তানি
সামরিক
বাহিনী ১৯৭১
সালের ২৫
মার্চে
বাঙালিদের
ওপর আক্রমণ
শুরু করে,সে
সম্পর্কে
আপনি কিছু
শুনেছিলেন কি ?
উ: হ্যাঁ,শুনছিলাম। তখন আমি
শুনছিলাম যে,খান
সেনারা ঢাকায়
আক্রমণ করছে। তারা
আক্রমণ করে
লোকজন
মারতেছে। পুলিশ
ব্যারাকেও
তারা আক্রমণ
করছে। ঢাকায়
খুব মারামারি
হচ্ছে। এ
রকম শুনতে
শুনতে আমাদের
এদিকেও তারা
আসি গেলো। এখানেও অনেক
লোক খানেদের
হাতে মারা
পড়লো। আমাদের
এখানে
বড়াইহাটের
ঐদিকে খান
সেনারা অনেকগুলা
লোককে মারি
ফেলালো। ওরা
শরণার্থী
ছিলো। ভারতে
যাচ্ছিলো। তাদেরকে
খানেরা মারি
ফেললো। এটা
শুইনা মনে হলো,এই দেশে
আর টিকা যাবে
না। তখন মনে
করলাম ভারতে
আশ্রয় নেই,তারপর
দেখি, কি
হয়।
প্র:
১৯৭১ সালে
আপনি কি
পাকিস্তানি
সৈন্যদের হাতে
আক্রান্ত
হয়েছিলেন
?
উ: না,আক্রান্ত
হই
নাই।
প্র:
আপনি কেন
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলেন ?
উ:
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলাম আমরা এই
দেশকে
ভালোবাসি বলে। এই দেশের
মানুষ,বাপ-মা, ভাই-বইন যারা
আছে,তাদের
ভালোর জন্যে
আমরা যুদ্ধে
অংশগ্রহণ করছিলাম। আমাদেরকে
ভারত থেকে এই
দেশে আবার
আসতে হবে। এই দেশে আসতে
হলে আমাদের
দেশ স্বাধীন
করতে হবে। এই রকম একটা
মনোভাব নিয়া
মুক্তিযুদ্ধে
গিয়েছিলাম। এখানকার
আমরা কয়েকটা
ছেলে ঠিক
করছিলাম যে এক
সাথে ভারতে
যামু। ১০/১১টা
ছেলে এক
জায়গায় আইসা
তারপর যাওয়ার
কথা ছিলো। আমরা মাত্র
দু’জন
সেখানে সময়
মতো আইসা দেখি
একটা ছেলেও
নাই। আমরা
দুই জন কেবল
গেছিলাম। আমার সঙ্গের
জন একবার কয়,নাহ,যাবো না,আর
একবার কয় যাবো,শেষে
দুইজনই রওনা
হইলাম। যাওয়ার
সময় দেখি আমাদের
গ্রামের এক
লোক,এখানে
যে মাইন পুতা
ছিলো, সেই
মাইন বার্স্ট
হয়ে তার ঠ্যাং
উড়ি গেছে। তার কাছে
যাইয়া দেখি যে
তার জ্ঞান আছে। এই সিনটা
দেখে আমরা মনে
মনে ভাবি
যুদ্ধে যাবো,নাকি
যাবো না। সাহসই করলাম,না
আমাকে যেতেই
হবে। আমি চলি
গেলাম
কামারপাড়া। কামারপাড়া
যাইয়া ভর্তি
হলাম। ভর্তি
হয়ে একটা রাত
ওখানে ছিলাম। এক রাত
পরে ওখানে ক্যাম্পের
লোকজন বললো যে,এখানে
আর জায়গা
হচ্ছে না। ওখান থেকে
আমাদের নিয়ে
গেলো মালদহের
এনায়েতপুর। একটা
স্কুলে
আমাদের রাখলো। তারপর
ওখান থেকে
বাছাই করে
নিতে নিতে
আমার সঙ্গী ঐ
বাছাইয়ের
মধ্যে পড়ে
গেলো। আমি
থাকলাম। আমি থাকার
পরে ওতো চলে
গেলো। তারপর
আমরা আবার
শিলিগুড়ি চলে
গেলাম। আমাদের
ওখান থাকি
নিয়ে গেলো ভোর
বেলা। শিলিগুড়িতে
যাইয়া আমাদের
হায়ার
ট্রেনিং শুরু
হইলো। ট্রেনিং
শেষে
বাংলাদেশে
যুদ্ধ করতে
পাঠালো আমাদের।
প্র:
আপনি
বাংলাদেশে
কোন্কোন্এলাকায়
যুদ্ধ করেছেন ?
উ:
আমাদেরকে
প্রথম নিছিলো
দক্ষিণের
দিকে ঘাটাইলে। এরপরে
ডেলার পাড়। প্রথমে আমরা
আসলাম
দেবীপুর। দেবীপুরে
আমাদের একটা ক্যাম্প
ছিলো। আমাদের
দলে ছিলো
কোতোয়ালী
থানার
ছেলেগুলা। পার্বতীপুরের
কয়েকটা ছেলেও
আমাদের সঙ্গে
ছিলো। আমরা
ছিলাম
দেবীপুর ক্যাম্পে। ওখান থেকে
আমরা ভিতরে
ঢুকলাম। ভিতরে ঢুকে
দেখি যে
এলাকায় কোনো
সাড়া শব্দ নেই। পরে অবশ্য
যুদ্ধ করছি ঐ
এলাকায়।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন
পাকিস্তানি
সৈন্যরা আক্রমণ
করলো ?
উ:
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
মাসের দিকে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
মাস থেকে তো
তারা আক্রমণ
শুরু করছে। আমাদের
এখানে আসে ওরা
ক্যাম্প করলো। প্রথম
বাজারে ক্যাম্প
করলো। তারপর
জলপাইতলিতে ক্যাম্প
করলো। ক্যাম্প
করে এখানে টহল
দেয়। লোককে
মারি ফেললো। আর বাড়ি
টারি জ্বালাই
দিলো। তখন
আমরা তো এদিকে
ছিলামও না।
প্র:
সে সময় আপনার
পরিবারের কেউ
শহীদ হয়েছে কি
?
উ: না,আমার
পরিবারের কেউ
শহীদ হয় নাই।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন থেকে
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয় ?
উ: এইটা
শ্রাবণ মাস
থেকে শুরু
হইছে।
প্র:
তখন
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
জনগণের
মনোভাব কেমন
ছিলো ?
প্র: তখন
জনগণের
মনোভাব ছিলো
বিভিন্নরকমের। কেউ
বলতেছে আমরা
বাংলাদেশ
স্বাধীন চাই। আরেক দল
কচ্ছে যে,আমরা
পাকিস্তানই
রাখবো। ঐদিকে
অর্থাৎ ভারতে
যারা গেছে
তারা কচ্ছে যে, না এই
দেশকে
স্বাধীন
করতেই হবে। মুক্ত করতেই
হবে।
প্র:
আপনার এলাকায়
বা গ্রামে
কারা রাজাকার
ছিলো ?
উ: এখানে
তো এগুলা বেশি
ছিলো। এগুলার
নাম যতটুকু
মনে আছে
বলতেছি। আশরাফ,মহির, মতিন,তারপরে বশীর,আবদুস
সোবহান। সোবহানের
ভাই কিন্তু মুক্তিতে
গেছিলো। আফজাল, মোজাম আরও
অনেকে ছিলো। সবার নাম
এখন মনে নাই।
প্র:
এই এলাকায়
শান্তি
কমিটি
ছিলো কি ?
উ: আমাদের
এলাকায় শান্তি কমিটি
ছিলো না।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
গ্রামের কি
অবস্হা
দেখলেন,গ্রামের
বাড়িঘর,স্কুল-মাদ্রাসা,মসজিদ-মন্দির,ব্রিজ-কালভার্ট
ইত্যাদি।
উ: গ্রামে
আইসা দেখি তো
সব মাঠ। কার
বাড়ি কোনটা
এইটা চিনার
মতো অবস্হা
নাই। খালি
চেয়ারম্যানের দোতালা
বাড়িটা ছিলো। ওটা পাকা
বাড়ি ছিলো। মাদ্রাসা
ঠিক ছিলো। আমাদের এখানে
ব্রিজ তেমন
ছিলো না।
প্র:
আপনার অস্ত্র কি
করলেন ?
উ: আমার অস্ত্র আমি
জমা করেছি। বলাহার ক্যাম্পে
অস্ত্র
জমা
দেওয়ার পর
আমাদের ডাকা
হলো মিলিশিয়া ক্যাম্পে
যাওয়ার জন্য। আমরা
মিলিশিয়া ক্যাম্পে
গেলাম। ওখানে
২ মাসের মতো
থাকলাম। মিলিশিয়া ক্যাম্প
বন্ধ হইলে বাড়ি
আইছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : আবদুল
কাইয়ুম
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : নভেম্বর ০৭, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৭৭