নাম : সত্যেন্দ্র নাথ রায়

পিতা : হরিবালা সরকার         

গ্রাম : পাটোল, 

ইউনিয়ন : পুনট্টি,

ডাক : আমবাড়ি-দৌলতপুর

থানা : চিরিরবন্দর,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৬/১৭

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: যুদ্ধ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়েছিলামজায়গার নাম, তারিখ আমার আর মনে নেইপাক সেনাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ চলছেএ সময় তাদের কয়েকজন গুলিতে নিহত হলে তারা আমাদের উপর ব্যাপকভাবে আক্রমণ শুরু করেআমরা তখন সেল্টার পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করছিলামসেল্টার পরিবর্তন করে আমরা একটা স্কুলে সেল্টার নিলামসেই স্কুলের মধ্যে থেকে আমরা পাকিস্তানিদের জবাব দিচ্ছিলামআমরা বুঝতে পারি নাই যে, তাদের কাছে রকেট লাঞ্চার আছেতারা রকেট লাঞ্চার দিয়ে আমাদের বরাবর গোলা মারলে রকেটের গোলা জানালা ভেদ করে আমাদের ঘরের মধ্যে এসে পড়ে এবং ওটা বার্স্ট হলে তার টুকরা লেগে আমি আহত হই

 

প্র: আপনি কত নম্বর সেক্টরেরর অধীনে যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: আমি ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেছি

 

প্র: কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: দিনাজপুরের ফুলবাড়ি, চিরিরবন্দর এবং পার্বতীপুরযুদ্ধের সময় ফুলবাড়ি থানার চিন্তামণ এলাকার কিয়দংশ আমরা স্বাধীন বলে ডিকলিয়ার দেই এবং আমরা ওখানে হাট বাজার বসিয়ে দেইহাট বাজারের ট্যাক্স আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আদায় করতামট্যাক্স কালেকশন করে আমরা আমাদের ক্যাম্পে জমা দিতামআমরা স্বাধীনতা ডিকলিয়ার করার পর একদিন ওই এলাকায় খান সেনারা আক্রমণ করেআমরা তখন মুষ্টিমেয় ৭/৮ জন ছিলামওদের আমরা চ্যালেঞ্জ করলে ওরা আমাদের ঘিরে ফেলেআমরা উপায় না পেয়ে অন্য পাড়ার একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে পাল্টা জবাব দিতে থাকিসেদিন আমরা এমনই অস্ত্রহায় অবস্হায় ছিলাম যে, আমাদের জীবন আর বাঁচে নাইতোমধ্যে স্হানীয় জনগণ পার্শ্ববর্তী ভারতে গিয়ে বর্ডার সংলগ্ন ক্যাম্পে সংবাদ দেয় যে, আমরা খানদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েছিতখন ওখান থেকে দেড়শ দুইশর মতো মুক্তিযোদ্ধা আসেতারা আমাদের কভারিং দেয়সন্ধ্যার দিকে খানেরা চলে যায়ভারত থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ায় আমরা সেদিন বাঁচতে পেরেছিলামঅন্যথায় সেদিন আমাদের ওখানে হয়তো মরতে হতো

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর দিনাজপুর যাওয়ার রাস্তা হয়ে সাঁজোয়া গাড়ি ইত্যাদি নিয়ে তারা আমাদের এলাকায় এসে ঢোকেতারা আমাদের এলাকায় বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ভয়ে অধিকাংশ মানুষ তখন ভারতে পালিয়ে যায়প্রথম দিন খান সেনারা বাড়িঘরে আগুন দিয়ে এবং কিছু লোক মেরে চলে যায়তারা পরে আবার আসে এবং জায়গা বিশেষে ঘাঁটি স্হাপন করেতারা  মা-বোনদের উপরে অন্যায় অত্যাচার করে

 

প্র: আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: না, আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয়নি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: মে মাসের দিকে আমাদের ট্রেনিং শুরু হয়তার মাস খানেক পর থেকেই তৎপরতা শুরু হয়েছে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: মুক্তিবাহিনীর প্রতি জনগণের পর্ণ সমর্থন ছিলোজনগণ মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় দিতো, মুক্তিবাহিনীদের তারা খেতে দিতোএমন কি যুদ্ধের সময় তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রেও এসে আমাদের খাদ্য পৌঁছে দিতো

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: হরনন্দপুরের আবদুল আজিজভবানীপুরে আবদুল আজিজ ও ফয়জুর রহমান, পাটোলের নুরু ও সালাম এবং আরো অনেকে ছিলো

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: ধনদু মৌলভী এবং হাসু হাজী

 

প্র: এই সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: না, দেশ স্বাধীনের পর ওরা আত্মগোপন করেছিলো

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি অবস্হা দেখলেন- স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, রাস্তাঘাট ইত্যাদি ?

উ: আমাদের গ্রাম বর্ডার এলাকায়প্রায় সবাই ভারতে চলে গিয়েছিলোকারো বাড়িঘর ছিলো নাআইসা দেখি বাড়িঘর মাঠ হয়ে গেছেমসজিদগুলো অসংস্কার অবস্হায় ছিলোসংস্কারের অভাবে মসজিদের কিছু কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলোমন্দিরগুলাকে তারা গুলি-গালাজ করে ভেঙে দিয়েছিলোস্কুলগুলাও অনুরূপ অবস্হায় ছিলোকতকগুলি স্কুলে খান সেনা বা রাজাকাররা ক্যাম্প করে ছিলোযে স্কুলে ওরা ক্যাম্প করছিলো সেগুলা ভাঙা চোরা ছিলো

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি কি করলেন ?

 

উ: যুদ্ধের শেষে অস্ত্র জমা দিয়া আমি আবার লেখাপড়া শুরু করলাম

 

 

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ২৭, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৯১