নাম : শেখ ফজর আহমদ

পিতা : মমতাজউদ্দীন আহমদ

গ্রাম : কচুয়া, ইউনিয়ন : কচুয়া, ডাক : কচুয়া

থানা : কচুয়া, 

জেলা : বাগেরহাট (১৯৭১ সালে খুলনা জেলার অন্তর্গত মহকুমা)

শিক্ষাগত যোগ্যতা : নবম শ্রেণী

১৯৭১ সালে বয়স : ১৯/২০

১৯৭১ সালে পেশা : মুজাহিদ বাহিনীর সদস্য

বর্তমান পেশা : চাকরি

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাক বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: সরাসরি পাক বাহিনীর হাতে আমি আক্রান্ত হই নাইতবে কচুয়া থানার ওসির বিশ্বাসঘাতকতায় তখন একটা বড় বিপদে পড়ছিলাম

 

প্র: ঘটনাটা বলবেন কি ?

 

উ: আমি আগেই বলেছি ১৯৭১ সালে আমি মুজাহিদ বাহিনী থেকে পালিয়ে আমার গ্রামে চলে আসিসেই সময় আমার গ্রামের একজন কচুয়া থানার আনসার কমান্ডার ছিলেনতার নাম ছিলো এস. এম. নূরুল হক২৫ মার্চ পাক বাহিনী ঢাকায় আক্রমণ শুরু করার পর তার সাথে আমি দেখা করে বললাম যে, আমি মুজাহিদ বাহিনীর নিয়মিত সদস্য, আমি গ্রামের যুবক ছেলেদের প্রশিক্ষণ দিতে চাইউনি আমাকে বললো যে, ঠিক আছে

 

   তার সাথে আলাপ করে আমি ২/৩ দিন পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে যুবক ছেলেদের ডাইকা নিয়া কচুয়া সিএস পাইলট স্কুলে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করিপ্রায় একশছেলে ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দেয়তাদের আমরা মোটামুটি ভালো প্রশিক্ষণ দিয়া ফেলাইতখন আমাদের এলাকার এম. পি. ছিলেন শওকত আলী দারু সাহেবঐ ট্রেনিং চলার সময় উনি একদিন মাঠে আইসে আমাদের ট্রেনিং দেখলেনআমি সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বেচ্ছাসেবক নিয়া উনাকে গার্ড অব অনার করলামদারু সাহেব খুব খুশি হলেন প্রশিক্ষণ দেখেআমি এম. পি. সাহেবকে বললাম যে, আপনি  কচুয়া থানার ওসি সাহেবকে বললে আমরা থানা থেকে ট্রেনিংয়ের জন্য রাইফেল নিতে পারিআমার মনে হয় উনি আমাদের পক্ষের লোকসে যদি আমাদের অন-ত কিছু রাইফেল দেয় তাহলে প্রশিক্ষণটা আমি এক সপ্তার ভিতরে আরো সুন্দর করে ফেলবানেতখন এম. পি. সাহেব ওসিকে ডাকাইলেনডাকাইয়া বললেন যে, ওকে কিছু রাইফেল দেওয়ার ব্যবস্হা করেনতখন ওসি সাহেব কয়েকটা রাইফেল আমাকে দেলো

 

   আমি প্রতিদিন সকাল সাতটার সময় থানা থেকে রাইফেলগুলা নিতাম আর পাঁচটার সময় জমা দিয়ে দিতামঐ রাইফেল দিয়া স্হানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়একদিন আমরা কয়েকজন সলাপরামর্শ করলাম যে, এই আমর্স আর থানায় ফেরত দেয়া যাবে নাআনসার কমান্ডারের সাথেও আমি আলাপ করলামসে বললো, কাজটা খারাপ হয় না, তয় তুমি এম. পি. সাহেবের সাথে একটু আলাপ করোএরমধ্যে হঠা গ্রামে গ্রামে লুটতরাজ, ডাকাতি শুরু হয়ে গেলোতখন আমি দৌড়ে চলে গেলাম এম. পি. সাহেবের কাছেতাকে বললাম যে লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ তো শুরু হয়ে গেছেকচুয়া থানার ৭টি ইউনিয়নের সব ইউনিয়নেই সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের উপরে অত্যাচার শুরু হয়ে গেছেএম. পি. সাহেব তখন বললো যে, ঠিক আছে, তোমার কাছে যে রাইফেলগুলো আছে সেই রাইফেলগুলো ভাগ করে ৭টা ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে দাও, আমি ওসিকে বলে দিচ্ছিতখন আমি সাতজন, দশজন, আটজন করি স্বেচ্ছাসেবকদের ভাগ কইরা দিয়া বিভিন্ন ইউনিয়নে পাঠালামআমি নিজে থাকলাম বাথালেবাথালে ডা. পঞ্চাননের বাড়িতে আমি ক্যাম্প করলামবাথাল কচুয়া থানার ভিতরে সবচেয়ে বড় একটা এলাকাঐ এলাকায় তখন কোনো সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মেয়েরা ইজ্জত নিয়ে ঘরে থাকতে পারতো না

 

   এলাকায় ডাকাতি, লুটতরাজ সমানে চলছিলোআমরা বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার পর ডাকাতি, লুটতরাজ কিছুটা কমে আসলোআমরা সারা রাত গ্রামে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতামদীর্ঘ দশ বারো দিন এভাবে চললোকচুয়া থানার সব ইউনিয়ন আমরা কন্ট্রোল করে ফেললামসংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের লোকজন মোটামুটি একটু শান্তির নিশ্বাস ফেললোতারা ভাবলো যে, স্বেচ্ছাসেবকরা এলাকায় ক্যাম্প করে আছেআমাদের মনে হয় অসুবিধা নাইঅবশ্য কিছু লোক আগেই ভারতে চলে গেছেকিছু কিছু তখনো গোপনে চলে যাচ্ছিলোপাক বাহিনী তখন বাগেরহাট দখল করে নিছেতারপরও আমরা এলাকায় আছিএকদিন হঠা থানা থেকে একজন পুলিশ আইসা আমাকে বললো যে, কচুয়া থানায় মিলিটারি অপারেশন করতে পারেএখন সমস্ত ইউনিয়নের আর্মসগুলি কালেকশন করে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে কালকের মধ্যে আপনাদের থানায় যেতে হবেওসি সাহেব আপনাদের অস্ত্রসহ থানায় যেতে বলেছেন

 

   আমার সহকারী কমান্ডার ছিলো জহিরুল ইসলামসেও এক্স আর্মিআমি উনাকে বললাম যে, কি করা যায়এর পিছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনাসে কিছু বলতে পারলো নাআমি সবাইকে খবর দিলাম এবং আমরা আর্মস নিয়া চলে গেলাম কচুয়াখবর পায় সবাই আসলোসকলের সাথে আমি কথা বললামআমি তাদের বললাম যে, পাক বাহিনী কচুয়া থানা আক্রমণ করতে পারেমিলিটারি গানবোটে আসলে আমরা তাদের মোকাবেলা করবোসবাইকে প্রস'ত রেখে আমি ওসি সাহেবের সঙ্গে বাজারে দেখা করলামউনি তখন বাজারে ছিলেনওসি সাহেবের নাম ছিলো আবদুর রউফতার বাড়ি ছিলো বরিশালতিনি আমাকে বললেন যে, আপনাদের তো বিরাট যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবেআপনারা থানায় চলে আসেনআমি রিলায়বল সোর্সে খবর পেয়েছি পাকিস্তানি আর্মি গানবোট নিয়ে যে কোনো সময় কচুয়া আসতে পারেআমি তার কথা বিশ্বাস করে থানায় গেলামঅন্য সবাইও থানায় আইলোওসি সাহেব বললো যে, আপনারা ক্লান্ত, বহু দূর থেকে আসছেন, এখন বাজে চারটা, আপনারা কোথাও রেস্ট নিয়া সন্ধ্যার ভিতরে থানায় আসবেনতার কথায় অনেকে চলে গেলোআমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকের বাড়ি আশে পাশেইওসি সাহেব আমাকে যেতে দিলেন নাবললেন যে, আপনি থানায় বসেনএখানেই রেস্ট নেনতারপর ওসি সাহেব আমাকে তার বাসায় নিয়া ভাত খাওয়াইলোখাওয়াইয়া বললেন যে, আপনি আমার বাসাতেই রেস্ট নেনআমাদের রাইফেলগুলা নৌকায় ছিলোনৌকা ঘাটে বান্ধাসেদিন আবার খুব বর্ষাখুব বর্ষা হচ্ছিলোসন্ধ্যা ৭টার দিকে ওসি সাহেব আমাকে বলে, চলো, তোমাকে বাজারে যেতে হবেতুমি আর আমি বাজারে যাবোএখন সমস্ত আমর্স জমা দিতে হবেআমি বলি কোথায় ? সে কয় বাজারেআমি বলি কেন ? সে বলে আমার উপর নির্দেশ আছে, ওখানে তোমাকে অস্ত্র জমা দিতে হবেনইলে আর্মি আমাকে গুলি করে মারবেতোমাকে যেতে হবেআমি বলি, আমি পারবো না স্যারতখন ওসি সাহেবের ইঙ্গিতে তিনজন পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরলোআর সি আই সাহেব পিস্তল হাতেআমি তো তখন নিরস্ত্রসি আই বললো, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্টতখন আমি নিরুপায়আমার সঙ্গী সাথী কেউ নাইওসি সাহেব আমাকে জোর কইরা নৌকায় তুলে দিলেনউনিও আমার সঙ্গে নৌকায় উঠলেনরাত আনুমানিক ১১টায় বাঁশঝাড় ঘাটে আমাদের নৌকা ভিড়াইয়া সমস্ত আর্মসগুলা একটা বাড়িতে উনি জমা করলেনরাতে আমি নৌকায় ঘুমাইলামসকাল বেলা সিও সাহেব আসলেনসিও সাহেব আমাকে বললেন যে, কমান্ডার সাহেব এখন তো আর কিছু করার নাইআপনাকে তো আমার আর্মির হাতে তুলে দিতে হবেআমি বলি, আর্মসগুলো আপনারা কায়দা করে নিয়েছেনএখন আমাকে আর্মির হাতে তুলে দিলেই তো ভালো হবে, এইটাই আমার যোগ্য পুরস্কারতখন সিও সাহেব চলে গেলেনকিছুক্ষণ পর সিও সাহেব ফিরা আইসা বললেন যে, এখন আপনাকে আমি আর্মির কাছে পুটআপ করবোআমি কই তাই করেনআমার বাঁইচে থাকার আর কোনো অধিকার নাইকারণ যে কৌশল কইরা আপনি আর ওসি সাহেব আমাদের আর্মসগুলা নিয়া আসালেন সেটা যদি আমি ঘুণাক্ষরে জানতে পারতাম, তবে আমাদের আনতে পারতেন নাআপনি আমাদের দলের লোক এবং আপনি বঙ্গবন্ধুর দল করতেনসে জন্য আপনাদের কথা বিশ্বাস কইরা, আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়া আমরা আইছিলামযেইটা করছেন ভালো করছেন, এখন আমাকে পুটআপ করেন আর্মির কাছেশেষ পর্যন্ত উনি আর আমাকে আর্মির কাছে পুটআপ করলেন নাতিনি আমাকে কচুয়া পাঠায় দিলেনওখানে পুলিশ আমাকে মুক্ত করে দিলোমুক্ত হওয়ার পর আমি ওখান থেকে পালায় অন্য জায়গায় গেলামপরে আকিজউদ্দীন নামে একজনকে সঙ্গে নিয়ে কবির সাহেবের সঙ্গে দেখা করলামতার একটা স্বেচ্চাসেবক দল পার্শ্ববর্তী থানায় ছিলোসে শেখ আবদুল আজিজ সাহেবের ভাইতার ওখানে যাইয়া দেখি যে, আর্মসের চাইয়া  স্বেচ্ছাসেবক বা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশিএটা দেখে আমি আর তার ওখানে থাকলাম নাসেই রাতেই আমি রওনা দিলাম বিষ্ণুপুরওখানে রফিকুল ইসলাম সাহেবের ক্যাম্পতিনি তখন নক্‌শাল পার্টির লিডারবিষ্ণপুরে তার ক্যাম্প আছে, সেটা আমি আগে থেকে জানতামখোঁজ নিয়ে ঐ ক্যাম্পে আমি গেলাম

 

   ক্যাম্পে আমি তার সঙ্গে দেখা করলামউনি পরদিন মিষ্টিপুরে মোহন ভট্টাচার্যের ক্যাম্পে আমাকে পাঠাই দিলোওখানে যাওয়ার পর তারা আমাকে তাদের সঙ্গে রাখলোআমি আর্মসও পাইলামআমি ঐ ক্যাম্পেই আছিচারদিন পরে খবর আসলো যে, শ্রীপুর থেকে পাক আর্মি মিষ্টিপুর ক্যাম্প এ্যাটাক করতে আসছেতখন ক্যাম্প ইনচার্জ আমাদের নির্দেশ দিলো এসাদপুর যাওয়ার জন্যআমরা ক্যাম্প ক্লোজ কইরা তখন এসাদপুরে গেলামঅনেক রাতে ওখানে আমরা খাওয়া-দাওয়া কইরা সকাল বেলা মাত্র ঘুমাইছিআর তখনই ঘন্টা বাইজা গেলোআমরা উঠে শুনি দাউরুহাট থেকে লঞ্চে একদল পাকিস্তানি পুলিশ বা মিলিশিয়া পানিজার পোড়ামারা বাজারের পাশে এসে আগুন ধরাই দিছেওরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালাইয়া দিছেআমরা তখন বাইচ নৌকায় উঠলাম ৪৭ জন লোকতখন ঐ এলাকায় নৌকা বাইচ হতোসেই বাইচ নৌকায় আমরা রওনা হলামআমাদের একটা বিল পার হতে হবেবিলটা লম্বা হবে দুই থেকে আড়াই মাইলঐ বিল পাড়ি দিয়া আমাদের যেতে হবেবিলের ভিতর ৮/১০ হাত পানিঐ বিল আমরা পাড়ি দিচ্ছিআগেই আমরা একটা পার্টি পাঠায় দিছিওরা আমাদের গোয়েন্দা পার্টিতাদের মাথায় ছিলো সাদা রুমাল বাঁধাআমরা যখন রেঞ্জের কাছাকাছি আইছি তখন দেখি কয়েকজন সাদা রুমাল রাইফেলের মাথায় ঘুরাইতাছেতখন আমরা মনে করছি যে, ওরা আমাদেরই লোকআমরা সেই বিলের পাড়ে যখন গেছি তখন ৭/৮ জন লোক আইসা আমাদের সামনে দাঁড়াইছেওরা আমাদের সিগনাল কি করে ঠিক পাইছে জানি নাওরা হঠা ঝড়ের মতো গুলি করা শুরু করলোআমরা তখন রাইফেল নিয়া বিলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়া পড়ে বাইচ নৌকার আড়পাশ চলে গেলামনৌকার আড়াল থাইকা আমরা গুলি চালানো শুরু করলামআমাদের ২টা ছেলে ওখানে মারা গেলোওদেরও বোধহয় কয়েকটা মারা গেলো

 

প্র: আপনাদের দলের যে দুজন নিহত হলো তাদের নাম কি ?

 

উ: একজনের নাম বোধহয় কিবরিয়াআর একজনের নাম জানি নাওরা আমাদের দাবড় খাইয়া লঞ্চে উইঠা লঞ্চটা ছাইড়া দিলোতখন বেলা বাজে আনুমানিক সাড়ে ৩টা কি ৪টালঞ্চ নিয়া ওরা পোড়ামারার দিকে গেলোপোড়ামারা বাজারে ওরা লঞ্চ থেকে গোলাগুলি করলোওদের গুলিতে ওখানে ২৭ জন লোক মারা গেলোএরপর ওরা চলে যায়আর আমরা ক্যাম্পে চলে গেলামক্যাম্পে যাইয়া আমাদের কমান্ডারকে বললাম যে, সামান্য আর্মস অ্যামুনেশন দিয়া কতক্ষণ টিকা যায়তিনি বললেন আমাদের তো আর কিছু করার নাইআমি তখন চিন্তা করলাম এখানে থাকলে যুদ্ধ তো করা যাবেই না বরং মারা যাইতে পারিতখন ওখান থেকে আমি একদিন পালাইয়া বাগদা বর্ডার হইয়া ভারতে চইলা গেলামভারতে যাইয়া আবদুল আজিজ সাহেবের সঙ্গে দেখা করলামআজিজ সাহেব দেশ স্বাধীনের পর মন্ত্রী হনযাহোক, তার একটা চিঠি নিয়ে গেলাম বশিরহাট ক্যাম্পেআমার সঙ্গে আরো ১৬ জন ছিলোআমরা মোট ১৭ জনবশিরহাট ক্যাম্প থেকে আমাদের আবার পাঠাইল