নাম : শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস

পিতা :  [ ? ]

গ্রাম : দেবীতলা, ইউনিয়ন : গঙ্গারামপুর

ডাক : দয়ারডাঙ্গা, থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৬

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : চাকরি

 

 

 

প্র: আপনাদের এই এলাকায় নির্বাচনের আগে ও পরে কি পরিস্হিতি ছিলো ?

 

উ: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমাদের এলাকায় লোকে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট দিয়েছিলোবেশিরভাগ লোক নৌকায় ভোট দিয়েছেতখন নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো  আমাদের এলাকায় কিছু মুসলিম লীগ সমর্থক লোকও ছিলোতাদের সংখ্যা ছিলো খুবই কমওটা গণনায় ধরা যায় নাআমাদের এই এলাকা হিন্দু প্রধান এলাকামুসলমানও ছিলোমুসলমানদের বেশিরভাগ আগে মুসলিম লীগ করতোসেই সময় তারা মুসলিম লীগ ছেড়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেনির্বাচনের পর প্রথম দিকে আমাদের এলাকার পরিস্হিতি শান্তই ছিলোনির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দেওয়ায় আমাদের মধ্যে এক ধরনের অস্হিরতা দেখা দিলো

 

   আমাদের এই এলাকায় তখন ছাত্রনেতা ছিলেন আমার এক আত্মীয়তার নাম ছিলো মনোরঞ্জন মন্ডলএ ছাড়া ইন্দ্রজি, জব্বার, হারুন-অর রশিদ এরাও পরিচিত ছাত্রনেতা ছিলোতারা এলাকায় আমাদের নিয়ে মিটিং মিছিল করতেনপাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দেওয়ায় আমাদের হিন্দুদের মধ্যে তখন বেশ ভয় ঢুকে গেলোআমাদের বড়রা একজায়গায় হয়ে দেশের পরিস্হিতি নিয়ে আলোচনা করতেনআমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেছিলো যে, পরে আমাদের উপর মানে হিন্দুদের উপর একটা চাপ আসতে পারেসেই সময় ছাত্র নেতারা আমাদের এলাকার লোকজনদের নানা রকম বুঝ দিতেনএ ভাবেই  দিন এগিয়ে যাচ্ছিলোএরপর তো পাকিস্তানিরা বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লোতখন পরিস্হিতি একদম বদলে গেলো১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর একটা রব উঠলো যে, হিন্দুরা আওয়ামী  লীগকে ভোট দিছেঅতএব তারা দেশের শত্রু

 

প্র: এই অবস্হা কখন শুরু হলো ?

 

উ: এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেতখন তো এ ব্যাপারে একটা ফ্লো উঠেছিলো

 

প্র: তখন আপনারা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করেছিলেন কি ?

 

উ: এর জন্য আমাদের প্রস্তুতি ছিলো না বললেই চলেদিনের বেলায় আমরা নিজ নিজ এলাকায় লাঠিসোটা নিয়ে ডিউটি করতাম মাত্রতার কিছু দিন পর দেবীতলার পাশের গ্রাম ফুলতলায় মিলিটারিরা গানবোট নিয়ে এসে গুলি শুরু করলোমিলিটারিরা গানবোট থেকে সরাসরি আমাদের এলাকায় গোলা মারেগোলা হরি এবং কারিদা মন্ডলের বাড়ি এসে পড়ে-এর দুদিন আগে মিলিটারিরা আমাদের পার্শ্ববর্তী জালনা স্কুলে গোলা মারেকামানের গোলায় জালনা স্কুলে আগুন ধরে যায়আমাদের গ্রাম থেকে একটু দূরে পুটিমারি এবং মাথাডাঙ্গাওই দিকেও প্রায় প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যেতোআমাদের গ্রাম থেকেই দেখা যেতো

 

প্র: এই আগুন কারা দিয়েছিলো ?

 

উ: খান সেনার সহায়তায় বিহারী আর কিছু মুসলমান এগুলা করতো বলে জেনেছিএ সমস- জায়গা হিন্দু এলাকাযখন বাড়িঘর পুড়ানো শুরু হলো তখন ঐ দিকের হিন্দুরা আমাদের এদিকে চলে আসতে লাগলোতখন আমরা চিন্তা করছি যে, আমাদের এখানে আর থাকা হবে নাআমাদের এলাকার হরিপদ বাবু তখন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেনউনি থাকতেন বরিশালওখানেই চাকরি করতেনএপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে উনি বরিশাল থেকে চলে আসেনবরিশাল থেকে এসে কয়েকদিন পর উনি বললেন যে, আমাদের ইন্ডিয়াতে যাওয়ার দরকার নাইউনি আরো বললেন যে, আমি থানায় গিয়ে আলোচনা করেছি, থানা থেকে আমাদের সব রকমের সাহায্য করবেআমাদের উপরে কোনো হামলা হবে নাউনি যেদিন আমাদের সাথে মিটিং করলেন, তার পরের দিনই মিলিটারিরা গানবোটে এসে ফুলতলা থেকে গোলাগুলি করেমিলিটারির ছত্রছায়ায় বিহারী আর বাঙালি  মুসলমান লুটেরারা লুটপাট শুরু করেহরিপদ বাবুর বাড়ি ছিলো ফুলতলাতেতখন উনি আমাদের এলাকায় পালিয়ে এলেনহরিপদ বাবু বললেন যে, এখানে আর থাকার কোনো পরিবেশ নেইতোমরা যে যেভাবে পারো ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নাওএই বলে উনি চলে গেলেনআমরা তখন প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলামঐ রাতেই অনেকে চলে গেলোআমরা কয়েকটা ফ্যামিলিপরের দিন যাবো ঠিক করলামপরদিনই আমরা রওনা দিলামতখন প্রায় প্রত্যেক বড়িতেই নৌকা ছিলোসেই নৌকা করে আমরা পশ্চিম দিকে রওনা দিলামতারপর তো লুটপাট ব্যাপক আকারে শুরু হলো

 

প্র: যারা লুটতরাজ করছিলো তারা কারা ?

 

উ: তাদের চেনার মতো অবস্হা তখন আমার ছিলো নাতারা যখন লুটতরাজ করছিলো তখন আমরা বেরোয়ে চলে গেলামআমাদের বাড়ি খোলা--গরু বাছুর, ধান চাল সব কিছু পড়ে রইলোপরনের কাপড় আর অল্প কিছু সোনা-দানা, টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো মতে আমরা চলে গেলামআমরা পাঁচ ভাই, জ্যাঠামনির দুই ছেলে, আমার বৌদি, মা সহ আমাদের বাড়ির সবাই একসঙ্গে চলে গেলামজ্যাঠামনির ছোট ছেলে একটু পরে যায়তার সঙ্গে আমাদের ডুমুরিয়াতে দেখা হয়আমরা প্রথম বাদামতলা যাইএরপর ওখান থেকে মাইলামারা যাইমাইলামারায় তখন হাজার হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছেআমরা ওখানে অপেক্ষা না করে সোজা ডুমুরিয়া চলে গেছি

 

প্র: ডুমুরিয়া পর্যন্ত যাওয়ার সময় আপনাদের কোনো সমস্যা হয়নি ?

 

উ: নাআমরা সবার আগেই মাইলামারা থেকে ডুমুরিয়া চলে গেছিডুমুরিয়া গিয়ে আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিজ্যাঠামনির যে ছেলে পরে রওনা হয়েছিলো-তিনি ওখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বললেন যে, আমাদের গ্রামের অনেক লোক মারা গেছেআমার দাদা তখন বললো যে, আমাদের এখানে আর থাকার দরকার নাইতখন ঐ রাতেই আমরা চুকনগরে চলে যাইমধ্যরাতে আমরা চুকনগর পৌঁছাইচুকনগর গিয়ে আমরা বাকি রাতটা থাকলামচুকনগর গিয়ে দেখি যে, লোকজন ওখানে ভর্তিমনে হলো চৌদ্দ পনেরো হাজারের অধিক লোক হবেলোকজন সমানে চুকনগর আসছেতখন সবার লক্ষ্য ইন্ডিয়া যাওয়া

 

প্র: আপনারা কতজন ছিলেন ?

 

উ: আমরা ২২ জনএটা শুধু আমাদের বাড়ি থেকে

 

প্র: আপনারা যে দলে ছিলেন সে দলে কতজন ছিলো ?

 

উ: আমরা যে বহরে ছিলাম সেই বহরে প্রায় ২/৩ হাজারের মতো লোক

 

প্র: চুকনগরে আপনারা ১৪/১৫ হাজারের অধিক যে লোক দেখলেন-তারা কোন্‌ এলাকার ?

 

উ: এরা আমাদের দেবীতলা, ফুলতলা, নদীর ওপার বুজগুনি, তারপর রামপাল, হরিনটানা, মাথাভাঙ্গা পুটিমারি-এসব এলাকার লোকখুলনা শহর থেকেও কিছু লোক চুকনগর এসেছিলো

 

প্র: চুকনগরে যারা এসেছিলো তারা কি সবাই হিন্দু সমপ্রদায়ের ?

 

উ: হ্যাঁ, সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের

 

প্র: কোনো মুসলমান পরিবার ছিলো না ?

 

উ: বোধহয় কোনো মুসলমান পরিবার ছিলো নাআমি মুসলমান শরণার্থী কাউকে দেখিনি

 

প্র: আপনারা চুকনগর পৌঁছার পর কি করলেন ?

 

উ: ওখানে রান্নাবান্না কোনো কিছু আমরা করি নাইচিড়া মুড়ি খেয়ে রাতটা আমরা কাটালামআমাদের রেস্টের প্রয়োজন ছিলোগত কয়েকদিন আমরা একটানা চলেছিতাছাড়া চুকনগর আসার পর লোকজন আলাপ আলোচনা করছিলো তারা কিভাবে ইন্ডিয়ার দিকে যাবেএকেক দল একেক দিক দিয়ে ভারতে যাচ্ছেআগেই ঠিক করেছিলাম আমরা যে দলের সঙ্গে এসেছি তারা যেদিক দিয়ে যাবে আমরাও সেদিক দিয়ে ভারতে যাবো

 

প্র: আপনাদের নৌকা কি করলেন ?

 

উ: নৌকা নদীতে রেখে আমরা ডাঙ্গায় চলে গেছিপরে নৌকা কি হলো সেটা আমরা জানি নাআমার জ্যাঠামনির বড় ছেলের নাম ছিলো সুধীরউনি খুব ভোরে বললেন যে, এখানে আর দেরি করা ঠিক হবে নাআমার বড় দাদার নাম ছিলো নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসউনিও বললো যে, এখানে আর দেরি করা যাবে নাতারপর তারা গিয়ে একটা বাস ভাড়া করলেনসেই বাসে শুধু আমরা নাআরও কয়েক ফ্যামিলি যাবেখুব সকালে সেই বাসে করে আমরা ৫০/৬০ জন চুকনগর বাজার থেকে চলে গেলাম

 

প্র: চুকনগর বাজার থেকে আপনারা রওনা দিলেন কখন ?

 

উ: তখন সকাল সাতটা/সাড়ে সাতটা বোধহয় বাজে

 

প্র: আপনারা যখন রওনা হলেন তখন চুকনগরের অবস্হা কেমন ছিলো ?

 

উ: তখন লোকজন গিজগিজ করছে চারিদিকেসবাই ভারতে যাবেদলে দলে লোক আসছেকেউ কেউ চলেও গেছে

 

প্র: ওখানে স্হানীয় লোকজনের আচরণ কেমন ছিলো ?

 

উ: তারা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি

 

প্র: তারা আপনাদের কোনো সাহায্য করেছে কি ?

 

উ: সাহায্য করতে কেউ আগাইয়া আসে নাই

 

প্র: বাসটা আপনারা কোথা থেকে ভাড়া করলেন ?

 

উ: ওখান থেকেইওটা সম্ভবত: সাতক্ষীরা লাইনে চলতোঐ বাসে করে আমরা ত্রিমোহনী পর্যন্ত যাই

 

প্র: চুকনগরে তো ঐ দিনই গোলাগুলি হয় ?

 

উ: হ্যাঁ, আমরা চলে যাওয়ার ২/৩ ঘন্টা পরআমরা ত্রিমোহনী গিয়ে জানতে পারলাম যে, চুকনগরে গোলাগুলি হয়েছেআমরা ত্রিমোহনী যখন গেলাম তখন বাজে বোধহয় তিনটা সাড়ে তিনটাত্রিমোহনী পৌঁছে আমরা ভাবলাম আমাদের আর বিপদ নাইকিন্তু সামনেই যে আমাদের জন্য একটা বড় বিপদ অপেক্ষা করছিলো-সেটা আমরা ভাবি নাই

 

প্র: চুকনগর থেকে ত্রিমোহনী কতদূর ?

 

উ: সেটা আমি বলতে পারবো নাআমি ঐ একবারই গিয়েছিলাম ত্রিমোহনীআর কখনও যাইনিখুব সম্ভব কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ির আশপাশে হবেত্রিমোহনী যাওয়ার পর আমরা একটা নদী পার হলামনদীটার নাম কপোতাক্ষ নদআমরা গিয়ে দেখি যে, ওখানে অনেক লোকআমাদের আগেই অনেক লোক ওখানে তখন পৌঁছে গেছেএখানেও চুকনগরের মতো লোক গিজ গিজ করছিলোনদী পার হয়ে আমরা হেঁটে পশ্চিম দিকে রওনা হলামসন্ধ্যার পর এক আম বাগানের পুকুর পারে আমরা রাত কাটালামজায়গাটার নাম আমার মনে নাইআমরা ৫/৬ হাজার লোক ওখানে রাত কাটালামসকাল বেলা আমরা আবার রওনা হলামহাঁটতে হাঁটতে বেলা ৯/১০ টার দিকে আমরা ঝাউডাঙ্গা পৌঁছলামঝাউডাঙ্গা বাজারের পূর্ব পাশে একটা ব্রিজ ছিলোব্রিজের মতো আর কি

 

প্র: ঝাউডাঙ্গা কোন এলাকায় ?

 

উ: সেটাও আমি বলতে পারবো নাঐ জায়গাটার নাম শুধু আমার মনে আছেঝাউডাঙ্গা সম্ভবত: সাতক্ষীরার কলারোয়া থানার মধ্যেএটা আমার অনুমানসঠিক জানি নাঝাউডাঙ্গা বাজারের পর একটা আধা পাকা রাস্তা দিয়ে লোকজন সীমা