নাম : শওকত আলী হাওলাদার

পিতা : মৃত মকসুদ আলী হাওলাদার

গ্রাম : ঝালডাঙ্গা, ইউনিয়ন : ধোপাখালি

ডাক : কামারগাছি দে পাড়া

থানা : কচুয়া, জেলা : বাগেরহাট (১৯৭১ সালে খুলনা জেলার অন্তর্গত মহকুমা)

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৮/১৯

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : বিডিআর-এর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি  কি জানেন ?

 

উ: ১৯৭০ সালের ঘটনা আমরা সবাই অবগততখন দেশে নির্বাচন হয়সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়কিন্তু পাকিস্তানি খানেরা আওয়ামী লীগকে তখন ক্ষমতা দেয় নাই  সে সময় আমি রাজনৈতিকভাবে জামাতে ইসলামকে সমর্থন করতামকিন্তু নির্বাচনের পর থেকে জামাতে ইসলাম পার্টিকে আমার পাকিস্তানিদের তাবেদার বলে মনে হতে লাগলোআমি দেখলাম তারা  এ দেশের বাঙালিদের ভালো বা মঙ্গল চায় নাএটা দেখে জামাতে ইসলামের প্রতি আমার সমর্থন প্রত্যাহার করলামআওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেতারাই সরকার গঠন করবেঅথচ পশ্চিমারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিলো নাআমরা দেখলাম ইলেকশনে ফল যাই হোক না কেন, পশ্চিমারা বাঙালিদের ক্ষমতা দিবে নাএরপর দেশে আবার আন্দোলন শুরু হলোতখন আমিও সেটা সমর্থন করলামআমার মতো আমাদের এলাকার অনেকেই সেটা সমর্থন করে

 

প্র: পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি  কি  শুনেছিলেন বা কি জানেন ?

 

উ: সেই সময় আমার কয়েক জন আত্মীয় খুলনার বিভিন্ন মিলে এবং ঢাকায় চাকরি করতো২৬/২৭ মার্চ তারিখে লোক মুখে আক্রমণের কথা প্রথম শুনলামএরপর আমার আত্মীয়-স্বজনরা ঢাকা এবং খুলনা থেকে গ্রামে আসার পর ঘটনা পুরোপুরি শুনলামঢাকার আত্মীয়রা বললো, খান সেনারা গোলাগুলি করে অনেক মানুষ মারছেবহু কষ্টে আমরা ঢাকা ছাড়ছিখান সেনারা ঢাকায় যেখানে সেখানে অগ্নি সংযোগ করছে, মানুষ মারছেখান সেনাদের খুন খারাপির জন্য ঢাকা থেকে এখন মানুষ পালাচ্ছেঢাকায় শুধু খান সেনা আর খান সেনা

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাক বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: নাতবে যুদ্ধ করার সময় রাজাকারদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিরায়েন্দা বাজারে আমরা চার দিনব্যাপী একটা লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করি

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম আমাদের দেশের জন্যে, বাঙালির স্বার্থেবঙ্গবন্ধু তখন যে ডাক দিছিলেন সেটা সঠিক ছিলোতিনি আমাদের বলেছিলেন, দেশকে স্বাধীন করার জন্যসেই জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিশুধু আমিই না, আমার পরিবারের আমরা আরো ৪ ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলামতিন ভাই ভারতে গেছিলামআমার এক ভাই তখন অবসরপ্রাপ্ত আর্মি ছিলেনতিনি যুদ্ধে শহীদ হনকচুয়া থানাধীন ভাসাইয়ের যুদ্ধে তিনি শহীদ হনতার নাম আতাহার আলীতিনি ওখানে তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে যুদ্ধ করছিলেন

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানিরা কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: আমার এলাকায় অনেক পরে পাক আর্মি আসেআমি তখন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলামআমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ১৫/২০ দিন আগে মাধবকাঠি মাদ্রাসার ওখানে বলেশ্বর নদীর পারে খান সেনারা আক্রমণ করেপরে ওখানে  রাজাকাররা ক্যাম্প করেক্যাম্প করার পর থেকে তারা আশপাশের লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন শুরু করেবাগেরহাট প্রপারে প্রথম কোনদিন তারা আক্রমণ করে সেটা আমি জানি নাআমার বাড়ির কাছে দশমহল্লা নামক একটা জায়গা আছে সেটা হিন্দু এলাকাঐ এলাকায় খান সেনারা গিয়া অগ্নিসংযোগ করেখান সেনারা কোনোটাই বাদ রাখে নাইতারা নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, রাহাজানি, হত্যাযজ্ঞ সবই করছেঅর্জুনভর গ্রামে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি ছিলোসেই আত্মীয়ের এক মেয়েকে তারা নির্যাতন করেতার নাম মর্জিনাআমরা তার কাছ থেকেই পরে ঘটনাটা শুনেছিসে বলতেই চায়নিবহুকষ্টে তার কাছ থেকে আমরা জানলাম যে, পাক আর্মি  তাকে এবং আরো চার পাঁচ জনকে বাগেরহাটে কিরণ দাসের বাড়িতে আটক করে নির্যাতন করছেপরে খুব মরণাপন্ন অবস্হায় তাকে পাক আর্মি ছেড়ে দেয়

 

প্র: তাকে কিরণ দাসের বাড়িতে কারা নিয়ে গিয়েছিলো ?

 

উ: খান সেনারাই তাকে কিরণ দাসের বাড়িতে রাখেপরে তাকে ছেড়ে দেয়তার মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলো রাজাকার কমান্ডার রজব আলী ফকিরতার বাবা-মা রজব আলীর কাছে যাওয়ার পর পাক আর্মি তাকে ছেড়ে দেয়খান সেনারা দশ মহল্লা গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পুরাটা অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছিলো

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছিলো কি ?

 

উ: হ্যাঁ, আমার ভাই আতাহার আলী শহীদ হয়েছে  সে আমার বড়আমরা  মোট ৮ ভাই, তার মধ্যে উনি সেজোকচুয়া থানার ভাসাইয়ের যুদ্ধে তিনি শহীদ হনতখন আমি ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দীন সাহেবের আন্ডারে স্মরণখোলার বগি নামক ক্যাম্পে ছিলামআমার ভাই মুক্তিযোদ্ধাদের যে টিমে ছিলো সে দলটায় নাকি মুক্তিযোদ্ধা খুব কম ছিলোআমি পরে ঘটনা শুনেছিঐ দলে তারা মাত্র ৯ জন ছিলোওনার কাছে ছিলো এল. এম. জি.বলেশ্বর নদীর ওপার থেকে শতাধিক রাজাকার এবং কিছু সংখ্যক খান সেনা তাদের উপর হঠা সাঁড়াশি আক্রমণ করেভাসাইহাটের কাছে আমার ভাই এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ছিলোবিপুলসংখ্যক রাজাকার এবং মিলিটারি দেখে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা পিছে হটে যায়আর রাজাকারদের মাঝে পড়ে যায় আমার ভাই আতাহারতারপরও আমার ভাই এল. এম. জি. দিয়ে অনর্গল গুলি চালিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেকিন্তু রাজাকাররা তাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে তার উপর গুলি চালায়আমার ভাই আতাহারের ডান হাতে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগেভাই আহত অবস্হায় মাটিতে পড়ে গেলে রাজাকাররা তাকে বেয়নেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করেসে নিহত হওয়ার পর রাজাকার এবং খান সেনারা ওখানে বিরাট এক মিছিল বের করেপরে তারা তার লাশ ওখানে রেখেই চলে যায়অবশ্য তার এল.এম.জি.টা তারা নিয়া যায়পরের দিন তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তার লাশ আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেমুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতেই তাকে দাফন করেতাজুল ইসলাম আমার আব্বার মাথায় বাংলাদেশের ফ্লাগ বাইন্ধে দিয়া ওনাকে খুব বুঝ দিয়া যানন্তানের মৃত্যুর পরও আমার আব্বার মনোবল অত্যন্ত শক্ত ছিলোআব্বা নাকি তাজুল ইসলামকে বলেছিলো, আমার আটটা ছেলের একটা গেছে, আমার কোনো দু:খ নাইসে দেশের জন্য শহীদ হয়েছেএ সব কথা আমি পরে শুনেছি

 

প্র: আপনার এলাকায় রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: রাজাকার আমার গ্রামের অনেক ছিলোযেমন-শহীদ হাওলাদার, ক্কারী আবদুল আজীজ, আফজাল হাওলাদার, আইয়ুব আলী হাওলাদার, শহীদ হাওলাদার-এরা রাজাকার বাহিনীতে ছিলোরাজাকার আমার গ্রামের চেয়ে মাধবকাঠি গ্রামে বেশিসংখ্যক ছিলোআবদুল হাকিম জিলানী, রুহুল আমীন শেখ, নুরু, দিদার, সোহরাব ফকির, দবির শিকদার, নজরুল শিকদার-এরা রাজাকার ছিলোআরো ছিলোএরা এখন দেশে বেশ ভালোভাবেই আছে

 

প্র: এই সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের যুদ্ধের পর ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: কেউ কেউ ধরা পড়েছিলোকিন্তু তারা পরে ছাড়া পেয়ে যায়অনেকেই আবার ধরা পড়েনিযারা ধরা পড়েনি তারা নিজ এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে গেছিলোযেমন-বাগেরহাটের রাজাকাররা অন্য এলাকায় পালায়ে যায়আবার অন্য এলাকার রাজাকার এখানে আশ্রয় নিছেঅন্য এলাকার রাজাকার আল-বদররা এখানে তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিছিলোতাদের আমরা চিনতাম নাবেশ কয়েক বছর পর এরা নিজ এলাকায় ফিরা গেছেএরা অনেকেই ধরা পড়ে নাই

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনার এলাকার অবস্হা কেমন ছিলো--স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাড়িঘর ইত্যাদি ?

 

উ: যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলো, যারা আওয়ামী লীগ করছে এবং হিন্দু সম্প্রদায়-তাদের বাড়িঘর বলা যায় হান্ড্রেড পার্সেন্টই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেতাদের সব বাড়িতে রাজাকার বা খান সেনারা অগ্নিসংযোগ করছে, লুটতরাজ চালিয়েছে

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: যুদ্ধের শেষে আমি আমার অস্ত্র জমা দিয়ে দিইআমার এস. এস. সি. পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো৭২ সালে আমি এস. এস. সি. পরীক্ষা দেইপাশ করার পর আমি পি. সি. কলেজে পড়াশোনা শুরু করিএরপর তো ১৯৭৫ সালের জুনে আমি বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এ যোগদান করি

 

 

 

 

সাক্ষাকার গ্রহণকারীর নাম : এ. কে. এম. ফজলে খোদা

সাক্ষাকার গ্রহণের তারিখ : এপ্রিল ২৫, ১৯৯৭

ক্যাসেট নম্বর : ১৪