নাম
: মোঃ
সোলায়মান
পিতা
: আনিতুল্লা
প্রামাণিক
গ্রাম
: রঘুনাথপুর
(ফকির বাজার), ইউনিয়ন : রামপুর
ডাক
: নূরুল মজিদ, থানা : পার্বতীপুর, জেলা : দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : অষ্টম
শ্রেণী পর্যন্ত
১৯৭১
সালে বয়স : ২০
১৯৭১
সালে পেশা : কৃষিকাজ, বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ
প্র:
১৯৭১ সালে আপনি
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন
কি ?
উ: ১৯৭১ সালে
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর হাতে আমি
আক্রান্ত হইনি।
প্র:
আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করলেন
?
উ: আমি আওয়ামী
লীগকে খুব ভালোবাসি, বঙ্গবন্ধুকে
খুব ভালোবাসি। তাঁর কথা মোতাবেক
আমি মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করছি
পাকিস্তানিদের হটাবার
জন্য।
প্র:
আপনার এলাকায় কখন
পাকিস্তানিরা আক্রমণ
করলো ?
উ: ২৫শে মার্চের
পর আক্রমণ করে। তারিখ আমার
মনে নাই। ওরা আমাদেক গ্রামে
আইসা বাড়িঘর লুটতরাজ
করে আগুন দিয়ে
জ্বালায়ে দেয়। লোক মারে। নারী ধর্ষণ
করে।
প্র:
পাকিস্তানি সৈন্যরা
কোথা থেকে এসেছিলো
?
উ: ওরা পার্বতীপুর
থেকে আসেছিলো। পায়ে হেঁটে
আসে, ট্রেনেও
আসে।
আমাদের
বাড়ির কাছে রেল
লাইন আছে। রেল লাইনের ওখানে
ওরা ট্রেন থামায়। ট্রেন থামার
পর ট্রেন থেকে
নেমে কয়েক গ্রাম
ঘেরাও করে। ঘেরাও করে গণহত্যা
শুরু করে। নারী ধর্ষণ করে। এইভাবে চলতে
থাকে দিনের পর
দিন।
প্র:
আপনি এইগুলি নিজে
দেখেছেন ?
উ: আমি নিজে
দেখেছি।
প্র:
তখন আপনি কি করছিলেন
?
উ: আমি মুক্তিযোদ্ধা
ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা
হয়ে ওদের সঙ্গে
মোকাবেলা করছি। কিন্তু কথা হলো, তখন আমাদের
সঙ্গে সেই রকম
হাতিয়ার ছিলো না।
প্র:
তখন আপনারা কি
ভয় পেয়ে চলে গেছিলেন
?
উ: চইলে যাই
নাই।
ওদের
সঙ্গে যুদ্ধ করছি, ওদের মোকাবিলা
করছি।
প্র:
আপনার এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনী এবং বিহারীরা
এসে কি কি করলো
?
উ: আর কি করবে!
ওরা তো আইসেই লোক
মারে, গণহত্যা
করে, নারী
ধর্ষণ করে, লুটতরাজ
করে।
ওদের
তো এইটেই কাজ! এই
তিনটেয় কাজ ছিলো।
প্র:
আপনার পরিবারে
কেউ শহীদ হয়েছেন
কি ?
উ: আমার পরিবারে
কেউ শহীদ হয় নাই। তবে আমার গ্রামের
লোকজন শহীদ হয়েছেন।
প্র:
আপনার এলাকায় মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা কখন থেকে
শুরু হয় ?
উ: মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু হয়
আশ্বিন মাসের দিকে। বাংলা আশ্বিন
মাসের দিকে।
প্র:
আপনি কখন মুক্তিযোদ্ধা
হিসাবে তৎপরতা
শুরু করেন ?
উ: ওই আশ্বিন
মাস থেকেই।
প্র:
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে তখন
আপনার এলাকায় জনগণের
মনোভাব কেমন ছিলো
?
উ: জনগণের
মনোভাব খুব ভালো
ছিলো বলেই তো আমরা
যুদ্ধ করতে পারছি। এখানে জনগণ
আমাদেক সহযোগিতা
করছে। আমাদের
থাকার ব্যবস্হা, খাওয়ার
ব্যবস্হা করছে। সংবাদ পৌঁছাইছে
আমাদের কাছে। জনগণের মনোভাব
খুব ভালো ছিলো।
প্র:
সে সময় আপনাদের
এলাকাতে কি লোকজন
ছিলো ?
উ: লোকজন ছিলো
টুকটাক। লোকজন বেশি ভাইগাই
গেছিলো। এখান থেকে অনেক
দরে চলে গেছিলো
লোকজন।
প্র:
যুদ্ধ চলাকালে
আপনাদের বিরোধিতা
কারা করেছিলো ?
উ: রাজাকার
আর আল-বদরেরা করছিলো। তারা আমাদের
পার্শ্ববর্তী
গ্রামের লোক। আমার গ্রামের
লোকও ছিলো রাজাকার। বিহারীরা ছিলো। মুসলিম লীগের
লোক ছিলো।
প্র:
যুদ্ধের শেষে স্বাধীনতা
বিরোধীদের ধরা
হয়েছিলো কি ?
উ: যুদ্ধ শেষে
একজনাক আমরা ধরছিলাম। ইন্ডিয়ার হলদি
বাড়ি থেকে ধইরে
নিয়ে আসছি। আমরা ধইরে নিয়ে
আসছি ঠিকই কিন্তু জনগণ তাকে
মাইরে ফেলছে।
প্র:
ইন্ডিয়াতে কি জন্যে
সে গিয়েছিলো ?
উ: দেশ স্বাধীনের
পর পলায়ে গেছিলো।
প্র:
আপনি মুক্তিযোদ্ধা
হিসাবে কোন্ কোন্
এলাকাতে যুদ্ধ
করেছেন ?
উ: আমি আমার
নিজের এলাকাতেই
যুদ্ধ করছি। নিজের এলাকা
পার্বতীপুর।
প্র:
পার্বতীপুর থানার
কোন্ কোন্ এলাকায়
যুদ্ধ করেছেন ?
উ: পার্বতীপুর
থানায় আমাদের প্রথম
অপারেশন ব্রিজের
ওখানে। আমরা
দুই পার্টি প্রথম
দিন রাজাকার আর
খানদের অ্যাটাক
করি।
ওখানে
আমাদের এক ছেলে
নিহত হয়। ছেলেটার নাম হলো
আনোয়ারুল হক। বাপের একমাত্র
ছেলে। ছেলেটাক
খানেরা মারছে।
প্র:
আপনারা কতজন মুক্তিযোদ্ধা
ছিলেন ?
উ: সেই দিন
আমরা ছিলাম অনেক।
প্র:
ঐ ব্রিজে পাকিস্তানি সৈন্য
কতজন ছিলো ?
উ: আমাদের
জানা মতে ছিলো
কয়েকজন। তবে রাজাকার ছিলো
অনেক। তার
মধ্যে আমরা ৮ জনাক
ধরি।
প্র:
এই ৮ জন রাজাকারকে
ধরে আপনারা কি
করলেন ?
উ: আট জন রাজাকারকে
আমরা ধইরা নিয়া
গেছি। আমাদের
মুক্তিযোদ্ধার
লাশও নিয়া গেছি। আমাদের একজন
মুক্তিযোদ্ধা
মারা যাওয়ায় সবাই
খুব উত্তেজিত হইয়া
এই আটজনকে মাইরা ফেলছে।
প্র:
আর কোথায় পাকিস্তানি সৈন্যদের
সাথে আপনারা যুদ্ধ
করেছেন।
উ: আমরা পার্বতীপুর
বাজারের দক্ষিণ
পার্শ্বে চকমুসাতে
যুদ্ধ করছি। ওখানে আমাদের
গ্রামের এক ছেলে
আহত হয়।
প্র:
দেশ যখন শত্রুমুক্ত
হয় তখন আপনি কোথায়
যুদ্ধ করেছেন ?
উ: সে দিন আমরা
ছিলাম করতোয়া ব্রিজে। ওই ব্রিজ সেদিন
ভাঙছি আমরা।
প্র:
ব্রিজ ভাঙছেন কেন
?
উ: ব্রিজ ভাঙছি
শত্রুর ক্ষতি করতে। এতো তাড়াতাড়ি
দেশ স্বাধীন হবে
এডা তো আমাদের
জানা ছিলো না।
প্র:
তখন পার্বতীপুর
কি শত্রু মুক্ত
হয় নাই ?
উ: না, হয় নাই।
প্র:
পার্বতীপুর কোন্
দিন শত্রু মুক্ত
হলো ?
উ: পার্বতীপুর
শত্রু মুক্ত হয়
দেশ স্বাধীনের
পরে।
যে দিন
খান সেনারা ঢাকায়
সারেন্ডার করলো
ওই রাইতে ওরা পার্বতীপুর
থেকে ভাইগে চলে
গেছে সৈয়দপুর।
প্র:
যখন পার্বতীপুর
থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা
চলে গেল তখন কি
করলেন ?
উ: যখন আমরা
রেডিওতে রাইত নয়টা
কি দশটার দিকে
সংবাদ শুনলাম যে, খান সেনারা
ঢাকায় সারেন্ডার
করছে তখন সঙ্গে
সঙ্গে আমরা পার্বতীপুরের
দিকে রওনা দিছি। আমরা যায়ে
দেখি সেখানে কোনো
বিহারী বা খান
সেনা নাই।
প্র:
পার্বতীপুরে গিয়ে
কি দেখলেন আপনি
?
উ: দেখলাম
দোকানপাটের তালা
ভাঙা, লুটপাট
হইছে।
প্র:
আর কি দেখলেন ?
উ: আর দেখছি
ফুলবাড়িত থেকে
ইন্ডিয়ান আর্মি
অ্যাডভান্স কইরে
পার্বতীপুর আসছে। আমরা ওদের
সঙ্গে যোগাযোগ
করছি।
প্র:
আর কি দেখেছেন
?
উ: আর দেখছি
কয়েকজন বিহারীকে। ওরা আমাদের
হাতে ধরা পড়ছিলো। এদের সংখ্যা
১৬ থেকে ১৭ জন।
প্র:আপনার
এলাকায় বিহারীরা
কি বাঙালিদের ওপর
অত্যাচার করেছিলো
?
উ: হাঁ, খানদের
সঙ্গে বিহারীরা
সহযোগিতা করছে। তারা খানদের
সাথে আসি গ্রাম
ঘিরছে। ওই বিহারীরাই
তো বেশি অত্যাচার
করছে। সবচেয়ে
বেশি অত্যাচার
ঐ বিহারীরা করছে
আমাদের এখানে। খানদের ওরা
নিয়ে আসে গ্রাম
ঘেরাও করে বাড়িঘর
জ্বালাইছে, লুটতরাজ
করছে, নারী
ধর্ষণ করছে।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনি
গ্রামে ফিরে বাড়িঘরের
অবস্হা কি দেখলেন
?
উ: বাড়িঘর
কিছু ছিলো না। আমাদের এলাকায়
কারও বাড়ি ছিলো
না।
প্র:
আপনার এলাকার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা-এইগুলির
অবস্হা কেমন ছিলো
?
উ: মসজিদ-মাদ্রাসার
কোনো ক্ষয়-ক্ষতি
হয় নাই। এইগুলার
ক্ষতি ওরা করে
নাই।
ভালই
ছিলো।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনার
অস্ত্র কি করলেন
?
উ: আমার অস্ত্র আমি এম.পি-র
মারফতে থানায় জমা
দিছি। জমা
দেওয়ার পর ওখান
থেকে একটা কাগজ
দিছে আমাদেরকে। ওই কাগজ নিয়া
দিনাজপুর যায়ে
মিলিশিয়া ক্যাম্পে জমা দিছি। মিলিশিয়া ক্যাম্পে আমাদেক
এক মাস রাখার পর
মিলিশিয়া ক্যাম্প ভাইঙে দিছে। তারপর আমরা
বাড়ি চইলে আইছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর নাম : ভবেন্দ্রনাথ
বর্মণ
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের তারিখ : ডিসেম্বর
০৭,
১৯৯৬