নাম : তৌহিদ মিয়া

গ্রাম : মন্দভাগ

ডাক : মন্দভাগ

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ৩০

১৯৭১ সালে পেশা : শ্রমিক

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

 

তৌহিদ মিয়া একজন শ্রমিককোনো প্রাতিষ্ঠানিক শ্রশিক্ষণ তিনি গ্রহণ করেননিকিন্তু বেশ কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেনতৌহিদ মিয়া বর্তমান সাক্ষাকারে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকবাহিনীর হামলার সময় আপনি কোথায় ছিলেন? এই আক্রমণের পর আপনি কি করলেন?

 

উ: আমি মিলে কাজ করতামমাছের মিলেতারপরে সংগ্রাম লাগলআমি খবর পাইলাম আমার এক মামু মারা গেছেমালিক থেকে টাকাটুকা লইয়া আমি রওয়ানা হইলাম বাড়িতে আসার জন্যআমার জাগা থেইক্যা হাইট্টা সিলেট টাউনে আইয়া আমি রেলে উঠছিশায়েস্তাগঞ্জ আইয়া সারছি পরই গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট মানি পাঞ্জাবির বোম পড়ছে গাড়ির ইঞ্জিনেগাড়ি এই দিন থেইকাই বন্ধআমরা দৌড়াইয়া নামলাম গাড়িত্তেলাইম্মা গিযা ইন্ডিয়া উঠছিএইডা উঠছি আপনের মনে করেন সংগ্রামের একবারে প্রথম দিকদাএরপর আমি বাড়িতে আইলামবাড়িতে আইয়া দেখলাম যে সত্যিই আমার গেরামে কোনো মানুষ নাইচতুর্দিকে গেছে গাপাঞ্জাবির ভয়ে কেউ ইন্ডিয়া,কেউ ভাটির দিকে যাচ্ছেআমি বাড়ি থেকে গেলাম মন্দভাগআমার মা,আমার নানী আছিল ঐ সময় তারার কাছে গেলামএরারে লইয়া প্রায় তিন মাস পরে বাড়িত আইলামসময়টা ভাদ্র মাস হইব যেইদিন সাঁঝঘইরা মাইরটা হয়এর আগের দিন সুবেদার ওহাব সাবে আমারে কইল তুমি আমার লগে চলসাঁঝঘরটা পড়ছে ব্রাহ্মণপাড়ায়তখন  গেলাম ঐ জগন্নাথপুর গুদারা ঘাটশিবির হচ্ছে পুস্কুর্নির পাড়রাতে আমরা এইহানে ডিউটি করিএর ভিতরে ঐহানে গোলাগুলি লাগছেআমরা ঐহান থেইকা পরদিন সহালে আইলাম এহানেওহাব সাব আমরারে পাডাইলআইয়া দেহি যে লাশ পইড়া রইছে খালের পাড়েএরপর নৌকা আইন্না এই লাশ উঠাইলামতারপরে নদী দিয়া চাঁনগলা স্টেশন লইয়া গেছিচাঁনগলা আমরা লাশ নিছি এগারো জনেরএইডিই আমরা পাইছিলাশটি দিয়া আমরা আবার বাড়িতে আইছিএর ভিতরে বিমান আইলবিমান আইয়া সাঁঝঘর কাঠেরপুল,পাকা মসজিদ এবং মন্দভাগ উত্তর হাটি কাঠের পুলে বোম্বিং করছেএইহানে মানুষ মারা গেছে একটা মাইট্টা কোডার (মাটির ঘর) ভিতরেআমরা আছিলাম একটা খেড় কইরার (খড়ের স্তুপ) তলেআমার উপরে গুলি লাগলোআমার মামী আছিল একজনআমার মামিরও গুলি লাগছেএরপরে এহেন থেইকা আমরা ডরাইয়া পরের দিনই গেলামগা ইন্ডিয়াভারতে যাওয়ার পরে সুবেদার ওহাব সাবের লগে আমি রইছিআমারে আর বাসায় যাইতে দেয় নাআমি কয় আমার মা বাপরে কেডায় পালবোআমি গরিব মানুষকয় তরে আটা,চাউল আমি দেমু তারা খাইব আর তুই আমরার লগে থাকবিতহনে হেরার লগে আমি থাহিএরপরে নয়নপুর যে ভিখারি আছে একজন,হের বাড়িতে বাংকার কইরা ফিট করল মেশিনগানএই মেশিন গানের সাথে আমি আছিলাম আর আছিল কুমিল্লার নূরুল ইসলাম হাবিলদার

 

প্র: কোন জাগাতে ফাইটিংটা হইল?

 

উ: বায়েক থেইকা ফাইটিংটা হলো নয়নপুর গাজির বাড়ি পর্যন্তআমরা আমাদের বাংকার থেইকা অর্থা ভিখারির বাড়ি থেইকা গুলি করছিকিন্তু কোনো শব্দ নাইপাঞ্জাবি সব গেছেগা এহেনতোআমরা এহেন দিয়া আইলাম ক্রলিং কইরাআইয়া দুই একটা বাংকারের ভিতর থাইকা হুনি মাগো,ও-মাগো শব্দবাংকারটা ছিল নয়নপুর বাজারের পূবদিকে একটা দালান আছেথ-সেই বাড়িতেতহন গেলাম বাংকারটার সামনেগেছি পরে ঐ যে হাবিলদার সাব,নূরুল ইসলাম আমারে কয়,এই যাইছ নামাইন-টাইন পাইতা রাখতে পারেনাইরে বাংকার থেইকা গুলি দিতে পারেআমি কই,না এডি বাঙালি বইলা আমার মনে হয়আমি আউগগাইয়া দেহামএরপরে আগ্গাইছিগিয়া দেহি একটা পাঞ্জাবি মরাআর তিনডা মেয়েএকটা মেযে মুসলমান আর দুইডা মেয়ে হিন্দুমাইয়াডির নাম মনে নাইতবে একজনের বাড়ি হইল ঢাকার নারায়ণগঞ্জ আর দুইজনের বাড়ি হইল নবীনগরতহন মাইয়াডিরে বাংকার থেইকা বাইর করছিএকটা মেয়ের উপরে গুলি লাগছে আর দুইডা মেয়ে ভালশিক্ষিত মেয়েএরপরে বাইর কইরা সারছি পরে কয় ভাই আমরারে বাঁচাওতারপরে আমি গাংগের থেইকা পানি আইন্না এরারে খাওয়াইছিখাওয়াইয়া সারছি পরে কয় ভাই,আমরার লগের আর একটা মাইয়া আছে কোনহান জানি তালাশ করএরপরে বিছাড়ান ধরলামবিছড়াইয়া সাত জন পাঞ্জাবি পাইলাম মরাআর রাজাকার পাইলাম একজন জেতাতার লগে কোনো হাতিয়ার নাইআর মেয়ে পাইলাম চাইরড্যা

 

তারা বলছে যে আমরারে ধইরা আনছেআইন্না এহেন অত্যাচার করছে,নির্যাতন করছেতারা খালি কান্দা কাটি করছেএরপরে তারার আমরা লইয়া গেলাম কোনাবননিলাম পরে সুবেদার ওহাব সাবে তারারে দেইখা গাড়ি দিয়া আগরতলা হাসপাতালে পাডাইছেতারারে লইয়া যাওয়ার প্রায় একমাস পরে দেশ স্বাধীন অইছে

 

প্র: গ্রামে ফিরে এসে কি অবস্হা দেখলেন?

 

উ: আইয়া দেখলাম ঘর দরজা বাড়িঘর একবারে ভাংগাচুরা,ঘাস উইঠা বাড়িঘর চিনার কোনো উপায় নাইবাড়িঘর কোনো আছিল নাটিনের ঘর-টর যেডি আছিল এডি কিছু আছিলআর ছনের ঘর যেইডা আছিল এইডা একেবারে শেষকোনডিতে আবার বাংকার করছেএরপরে মনে করেন মেঘ-বাদলে আর বোমেতো ভাঙছে অনেকে

 

 

সাক্ষাকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাকার গ্রহণের তারিখ : ১ অক্টোবর ১৯৯৬

ক্যাসেট : কসবা  ৫৮