নাম : তুনদুরন বেওয়া

স্বামী : তাহের উদ্দীন (১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নিহত)

গ্রাম : প্রাণকৃষ্ণপুর, ডাক : পুটিমারা, ইউনিয়ন : পুটিমারা

থানা : নবাবগঞ্জ, জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : চতুর্থ শ্রেণী

১৯৭১ সালে বয়স : ৩০

১৯৭১ সালে পেশা : গৃহবধূ, বর্তমান পেশা : গৃহিনী

 

 

 

প্র: ১৯৭০-৭১ সালের কথা কি আপনার মনে পড়ে ? যুদ্ধের কথা ?

 

উ: তহন একটা ভোটাভুটি হইছিলোমোরা নৌকাত ভোট দিছিতারপর দেশের মধ্যে যুদ্ধ নাগি গেলোখানরা মানুষ মারি ফেলালোমেয়ে মানুষক নির্যাতন করিলো

 

প্র: আপনাদের গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করেছিলো কি ?

 

উ:, আক্রমণ কয়েকবার করিছেপরে একদিন রাইতের বেলা গ্রামটা খানরা আবার ঘেরাও করছিলোকেউ জানবার পারে নাইভোররাতে সবাই জাগি উঠলোজাইগা দেখে চারপাকে খানরা ঘিরি আছেযেই পাকে মানুষ যায় সেই পাকেই খানকোনো পাকেই খালি নাইসব পাকেই ওরাকেউ বারাইতে পারে নাইএতোগুলাই আসছিলো ওরা

 

প্র: তারপরে ?

 

উ: ভোর হইলোতখন ওরা বাড়ি বাড়ি ঢুকলোঅর্ধেকগুলা ঘেরাও দিয়া থাকলো আর বাকিগুলান বাড়ি বাড়ি ঢুকলোঢুকে পুরুষ মানুষক ডাকি ডাকি নিয়া গেছেতাদের নিয়া এক জায়গায় জমা করি মারিছেপুরুষ মানুষক সব নিয়া গেলোমোরা বাড়িত তো শানি পাচ্ছি নাসে সময়ে মনে করেন যে, হামার কিয়ামত আইছিলোকিয়ামতের লাকানযা দুঃখ হইছে বাবা সেগুলি বইলি আর কি হবিপুরুষ মানুষক ধইরা নিয়া গেলোমেয়ে ছেলের উপর নির্যাতন করিলোনির্যাতন করে টরে হ্যারা গেছেমোরা বিলত (বিল) নাইমে আছি, কেউ সুল্লিত (দুই বাড়ির মাঝখানের অপ্রশস্ত জায়গা) সাইন্দে আছি, কেউ পানিত নাইমে আছিলামওত (ওখান) থাকি ভরভরি শব্দ খালি শুনিআমরা জানি না যে মাইরে ফেলাইছেঅতো লোক সবাক মারি ফেলাইবে কোনো দিনও ভাবি নাইএকটা লোক আইসে মোক আর কয়জনাক খবর দিলো যে, গ্রামের সব লোকরে ওই জায়গায় খানেরা মাইরে ফেলাইছেতার আগে লুকাইয়া একবার মুই ওইহানে গেছিলামযায়ে দেখি যে খালি লাইন করিছে, মুক দেখি খানরা রাইফেল তুলিছে, মুই ফির আবার দৌড়াইছি

 

প্র: দৌড়ে কোথায় গেছিলেন ?

 

উ: গাওতএ বাড়িত থাকি ও বাড়িত যাচ্ছি, ওডি যাচ্ছি, ওডিও দেখি খানকোনো পাকেই আর রেহাই পাই নাখানরা মোকও ধরছিলো

 

প্র: আপনাদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন ধাওয়া করছিলো তখন কি তারা গুলি করছিলো ?

 

উ: মোক গুলি করে নাইঅন্য দুইজন মেয়ে মানুষক গুলি করছিলোওই দুইজনের নাম সয়না, আর ছালুখুব অত্যাচার কইরেছে মেয়েছেলের উপরেখুব অত্যাচার

 

প্র: কখন অত্যাচার করছিলো ?

 

উ: গ্রাম থাকি পুরুষ মানুষ সব ধইরে নিয়ে গেলোএকগুলা খালি পুরুষ মানুষক ধইরে নিয়ে গেলো, আরেকগুলা খালি বাড়িত সান্ধায়এখানে ওখানে সান্ধায়সান্ধায়া মেয়েছেলেক ধরিছেধরে নিয়া হেরা মেয়েছেলের উপর খুবই অত্যাচার করিছে

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যরা মেয়েদের উপর কি খুবই অত্যাচার করেছে ? আর কি করেছে ?

 

উ:হেরা খুবই অত্যাচার টত্যাচার করে চলি গেছেতারপর মোরা আবার এখানে ওখানে লুকায়ে ছিনুলুকায়ে থাকতেই ভরভরি আওয়াজ পাইনুঅনেকক্ষণ পর এক লোক আইছেতহন শুনলুম সবাই মারা গেছেখবর পাইয়া মোরা সব ওইহানে গেছিমোরা কান্দাকাটি করছিফির তো আবার খবর আইছে, খানরা নাকি আবার আইতেছে, ফির মোরা দৌড় দিছি।। হামার কিয়ামত গেছে বাবাসেইলা দুঃখের কতা আর এহন তোরা শুইনে কি কইরবেন

 

প্র: তারপরে ?

 

উ: তারপরে ওইদিন বাইরের আত্মীয়-স্বজন আইসে সবাক মাটি চাপা দিছেনাই গুসুল (গোসল), নাই ওজু, নাই কাপড়কোনো রকমে সবাক মাটি চাপা দিছেনেপের ওয়ার, মুশুরি (মশারি), ওইলে দিয়ে মাটি চাপা দেছেগোরস্তান নিয়া গেছে সময় খানরা উল্টে ফির আয়েছেমাটি দিবার লোকে ফির আবার দৌড়াইছেএই রকম করে কোনোরকমে সবাক মাটি চাপা দিছে

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যরা সে দিন মোট কতজনকে হত্যা করেছে ?

 

উ: ম্যালা, য়ের উপর গেছে বোধ হয়মোর এহন খেয়াল নাইকেউ মোর ভাই হয়, কেউ ভাতিজা হয়, কেউ চাচা হয়, কেউ খুড়া হয়খালি স্বামী বুইলে নয়সবাই গ্রামের আত্মীয়তহনকার জন্যে চিন্তা করিসে যে কি দিন গেছে মোদের

 

প্র: খান সেনারা লোকজনকে হত্যা করে কোথায় গেলো ?

 

উ: চলে গেল এক্কেরে ঐ বলাহারের দিকে

 

প্র: বলাহার থাকতো ওরা ?

 

উ:ওরা পাল শুইদ্ধে দল ধরে গেলো

 

প্র: তারপর আপনি বাড়িতেই ছিলেন ?

 

উ: বাড়িতেই ছিনুওরা ফির আয়েছে, ফির দৌড়াদৌড়ি করিছিফির বাড়িত আইছিসবাই যে দিকে যায় মুইও সে দিক গেছিমোর বাড়িত তো লোক নাইমোর একটা ছোট বাচ্চাসবাই যি দিক যায় মুইও ঐ ছেলেক নিয়া সিটি যাইছেলে তো কেবল সাড়ে তিন বছর বয়েসএই ছেলেক নিয়া আমি আর কোথায় যাবার পারি নাখান সেনারা বাড়িঘর সব পুইড়ে দিছে, ভাঙি দিছেকি করে দিছে! আহারে ! আমার বাপ নাই, মাও নাই, আমার ভাই নাই, একটা ভাই, তাকও মারি ফেলালোআমার ছোটকালে বাপ মারা গেছে, মাও নাইমোক যে কেউ উপকার কইরবে সে লোক মোর নাই

 

প্র: আপনার পরিবারের কয়জনকে হত্যা করেছিলো খানেরা ?

 

উ: সে দিন মারিছে গ্রামের সব লোকগুলাকআমার স্বামীক মাইরছেভাইওক মারিছেআর সবাই তো আত্মীয় স্বজন

 

প্র: আপনার ভাইকে কখন মারছে ?

 

উ: ভাইকেও ওই একই দিনে মারিছে

 

প্র: আপনার ভাইয়ের নাম কি ?

 

উ: মফিজএকই দিনে সব মারিছেতহন না ভায়ের তনে (জন্য) কান্দি, না স্বামীর তনে কান্দি, না ভাতিজার তনে পস্তাই- এইরকম অবস্হা আর কি

 

প্র: খানরা আপনার ভাতিজাকেও মারছিলো

 

উ:, ভাতিজাও মারা গেছে

 

প্র: আপনার ভাতিজার নাম কি ?

 

উ: আইজর মিয়াভাসুরের ব্যাটা, ভাতিজা

 

প্র: যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী আসছিলো এদিকে ?

 

উ: মুক্তি ? মুক্তি তো পরে আইছিলো

 

প্র: আসছিলো এখানে ?

 

উ:খানরা রাস্তা দিয়ে যায় আর কয় ব্যাটারা সব মুক্তি পকেটে রাখিছেএইলা কথা কয়মুক্তি তো তহন ইন্ডিয়াত গেছিলোপরে আইছিলোমুক্তিরা আইসে আর কি কইরবেখানরা তো সব সাফ করে দিছেমুক্তিরা আইসে আর কি কইরবে ? দুঃখ প্রকাশ কইরে কি হবি আর ? তহন আমার ছেলে ছিলো খুবই ছোট্টফির তাক কতো কষ্ট দুঃখ কইরে মানুষ করনু, কতো কষ্ট দুঃখ কইরে শিক্ষা দিনুহে এহন বড় হইছেচাকরি করেওর আয়ে মুই কোনো মতে সংসার চালাই

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : অমরচাঁদ গুপ্ত অপু

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ০৫, ১৯৯৬