নাম : জহিরুল আলম
(মিলন)
গ্রাম
:
আকছিনা
ডাক
:
কসবা
ইউনিয়ন
:
কসবা
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : ১৯/২০
১৯৭১
সালে পেশা : এইচ. এস.
সি. দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্র
বর্তমান
পেশা : সরকারি
চাকুরি
জহিরুল
আলম ট্রেনিং
শেষে সালদা
নদী,শিমরাইল,মেহারী,পানগড়া
ইত্যাদি
এলাকার
যুদ্ধে অংশ
নেন। তিনি
তাঁর সাক্ষাৎকারে
জনগণের
সাহায্য-সহযোগিতার
কথা,যুদ্ধের
কথা,ট্রেনিং
গ্রহণের কথা
এবং
পাকিস্তানি
অত্যাচারের
কথাসহ
বেশকিছু
প্রশ্নের
উত্তর দিয়েছেন।
প্র:
২৫শে মার্চ
রাতে
পাকবাহিনীর
হামলার খবর শুনে
আপনি কি করলেন?
উ: বাঙালির
উপর যখন আঘাত
আইসা গেছে তখন
তো আমরা বইসা
থাকতে পারি না। তহন আমরা
ছাত্রলীগ
করতাম। আওয়ামী
লীগের ঘোর
সমর্থক। অ্যাডভোকেট
সিরাজুল হক
সাহেব
কিছুদিন পর কসবা
আসছিল। উনি
বললেন যে, তোমাদের
প্রশিক্ষণ
নিতে হবে। তখন উনি
জাতীয় সংসদের
সদস্য। আওয়ামী
লীগের
নির্বাচিত সদস্য। আর
প্রাদেশিক
পরিষদের
সদস্য তখন ছিল
এমদাদুল বারী। তখন এই
হামলার খবর
শুনে আমাদের
মনে ক্ষোভ জমছে
আরকি।
প্র:
১৯৭১ সালে
আপনি কি
আক্রান্ত
হয়েছিলেন?
উ: আক্রান্ত
বলতে আমার
বাড়ি তো সব
জ্বালাই
দিছিল। বাড়িঘর
সব ভাইংগা
নিয়া গেছিল। ঐদিক দিয়া
মোশাররফ
কনট্রাকটরের বাড়িও
আগুন দিয়া
জ্বালাই
দিছিল। কিন্তু ঘর
ভাইংগা নেয়
নাই। এ
গ্রামের
মধ্যে আর কারো
ঘর ভাংগে নাই। দেশ
স্বাধীন
হওয়ার পর আইসা
দেখি আমার
কিছু নাই।
প্র:
আপনি কেন
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলেন?
উ: ঐ যে
বললাম পাকিস্তানিরা
আমাদেরকে
শোষণ করতেছে। আমার ঐ
সময় চিন্তা হইল যে
দেশের জন্য
কিছু একটা করি। বয়সে তখন
তরুণ ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর
ভাষণ
বিশেষভাবে
এফেকট করছে যে
নির্বাচিত
প্রতিনিধির
কাছে ক্ষমতা
কেন দিবে না। আমার
গ্রামের আরো ৭
জন আমরা
একসাথে
মুক্তিযুদ্ধে
গেছি। প্রথম
গেলাম আমরা
আগরতলা
চারিপাড়া
স্কুলে যে
ট্রানজিট
ক্যাম্প ছিল
সেখানে। ঐখান থেইকা
আমাদেরকে
নিয়া গেল আসাম
তেলিয়ামুড়ার
অমপিনগরে। ঐখানে আমরা
এক মাস
ট্রেনিং
নিলাম। তখন
আমার
প্রশিক্ষক
ছিলা আমার
খেয়াল আছে ক্যাপ্টেন
আই. সি. ভাটিয়া,রাজপুত। এইডা অনেক
বড় ক্যাম্প। এখানে
ইন্ডিয়ান
আর্মিও থাকতো। আমরা
অমপির
সেকেন্ড
ব্যাচ। আমাদের
আগে একটা
ব্যাচ গেছে।
প্র:
আপনার এলাকা
কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করেছিল?
উ: আমার
যতটুকু মনে
পড়ে এপ্রিল
মাসে। ডেটটা
ঠিক খেয়াল নাই। এরপরেই
আমি ভারতে
গেছিলাম।
প্র:
তারা কিভাবে
আপনার এলাকা
আক্রমণ
করেছিল?
উ: ওরা
প্রথম সাবেক
মন্ত্রী টি.
আলী,(তফাজ্জল
আলী সাহেব)
উনার বাড়িতে
আইসা ক্যাম্প
করলো। ঐখানে
ওদেরকে
কিছুটা
প্রতিরোধ করা
হইলো গরুবাজার
থেইকা। থানাতে
কিছু আর্মস
ছিল এবং
ব্যক্তিগত
বন্দুক
টন্দুক যাদের
ছিল পাখি
শিকারের তাই
দিয়ে প্রতিরোধ
করা হইছে। পাকিস্তানিরা
গরুবাজারে
আগুন লাগাইল। আগুন
লাগানোর পরে
ওরা আবার
পুরাণ বাজারে গেল। পুরাণ
বাজারে যাইয়া
বাজারের সমস্ত
কিছু আগুন
দিয়া পুড়াইয়া
ফেললো। তারপরে
হিন্দু এলাকা
যেটা ছিল সাহা
পাড়া সেখানে
ওরা আগুন
লাগিয়ে সমস্ত
বাড়িঘর
পুড়াইয়া
ফেলছে। তখন
আমরা পুরাণ
বাজারে ছিলাম। ঐখান থেকে
ঐদিন আমরা
ভারতের
কালীবাড়িতে অবস্হান
নেই। আমি পরে
আবার নিজের
বাড়িঘর দেখার
জন্য আসছিলাম।
প্র:
ট্রেনিং শেষে
আপনি
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলেন কোন
এলাকায়?
উ: আমরা
ট্রেনিং নিয়ে
আসলাম মেলাঘর
ক্যাম্পে। মেলাঘর
ক্যাম্পের
চার্জে ছিলেন
ক্যাপ্টেন হায়দার। ঐখানে
আমাদেরকে
একদিন ফল-ইন
করলো। ফল
ইন করার পরে
আমাদেরকে
বাছাই কইরা
গেরিলা
হিসাবে ভিতরে
পাঠাই দিল। আমাকে পাঠাই
দিল সালদা নদী
এলাকায়।
প্র:
আপনি কোন কোন
এলাকায় যুদ্ধ
করেছেন?
উ: কসবা
স্কুলের
জব্বার
স্যারের
বাড়ির কাছে আমাদের
বাংকার ছিল। ঐ বাংকারে
আমি ছিলাম। ঐখান থেকে
পরে আমি
ক্যাপ্টেন
আইনউদ্দিন
সাবের অধীনে
চলে যাই। দু’মাস
সালদা নদী
এলাকায় থাকার
পরে গেরিলা
হিসাবে চইলা
আসছি
ক্যাপ্টেন
আইনউদ্দিন
সাহেবের
আন্ডারে। শিমরাইল
ফাইটে আমি
ছিলাম,মেহারী
ফাইটে আমি
ছিলাম। তারপরে
পানগড়া ফাইটে
আমি ছিলাম। তখন আমাদের
কমান্ড করতেন
আর্মি পারসন
নায়েক কাদির। আমি ছিলাম
১০ জনের লিডার
মানে সেকশন
কমান্ডার। আমার সেকশনে
ছিল পীয়ার,মজনু
এরপর আমার
গ্রামেরই
নাসির। ওরা
আজও আছে। ভৈরবপুরের
হালিম,উনি আর্মি
পারসন। উনি
আরেকটা
কোম্পানিতে
ছিলেন। উনি
কিন্তু মেহারী
ফাইটে ছিলেন। দেশ
স্বাধীন
হওয়ার আগে
মারা গেলেন ঐ
পুলটার মধ্যে। এই ভৈরবের
পুলটাকে কিন্তু হালিম
সেতু বলা হয়। এরপর আমি
এইখান থেইকা
মেহারী থেকে
গেছি। মেহারী
থেকে গেলাম
শিমরাইলে। শিমরাইল
ফাইট হইল। আমাদের এক
কলিগ আলমগীর
মারা গেল। তাঁর কবর কিন্তু এখনও
শিমরাইল
মাইজপাড়া
স্কুলে আছে। এর বাড়ি
বোধহয় আখাউড়া
ছিল। মমতাজ,আজীজ
ভাইদের যে
বাড়িটা আছে
সেইখানেই সে
গুলি খাইছে।
প্র:
শিমরাইল-মেহারী
এলাকার লোকজন
আপনাদেরকে
কিভাবে সাহায্য
করতেন?
উ: এটাতো
বিরাট
ব্যাপার। আমাদের
খাওয়া-দাওয়ার
সম্পূর্ণ
দায়িত্বে ছিল
ঐসব এলাকার
জনগণ। আমরা
জাস্ট ডিউটি
দিছি,বিভিন্ন
জায়গায় খবর
নিছি। মাঝে
মাঝে কুঠি,চৌমুহনী
আসতাম। চৌমুহনী
আসতাম। আমরা
নৌকা নিয়ে
আসতাম। তখন
বর্ষাকাল ছিল। আমরা
পাঞ্জাবিদের
গনিবিধি
লক্ষ্য করতাম। গ্রামের
মানুষ আমাদের
পাক কইরা
আইন্না খাওয়াইছে। শুধু তাই
নয়,অনেক
সময় দেখছি
কোনো এক
জায়গায়
গেলাম-খেয়াল আছে
মেহারী
ফাইটের পরে
রাত্রের বেলা
আমরা চইলা
গেলাম
শিমরাইলে। আমরা ৭০/৭৫ জন
মুক্তিযোদ্ধা
ছিলাম। সেই
রাতে গ্রামের
গরিব মানুষে
আমাদেরকে
প্রত্যেক ঘরে
ঘরে ভাত
খাওয়াই দিল। এরা
আমাদেরকে
খাওয়াইছে
ধরেন কোনো ঘরে
৩ জন কোনো ঘরে
৫ জন-এইরকম
ভাগ করে
খাওয়াইছে।
প্র:
তখন আপনাদের
অবস্হান থেকে
পাক হানাদার বাহিনীর
অবস্হান
কতদূর ছিলো?
উ: আমরা
তখন মেহারী
গ্রামে। এইখানে ফাইটটা
আরম্ভ হইছিল
খুব ভোরে। আমরা তখন
সারারাত্র
ডিউটি দিয়া
যার যার অস্ত্র
একটু
পরিস্কার
করছিলাম আর কি। তার মধ্যে
হঠাৎ এরা আমাদের
আক্রমণ করলো। আমরা তখন
প্রস্তুত ছিলাম
না। তারা
একটা বড় নৌকা
নিয়া আসছিল। আমরা
বুইঝা ফেলছি
পাঞ্জাবি
আসছে। পাঞ্জাবি,রাজাকারগুলা
সিভিল ড্রেসে
আসছিল। সারাদিন
ফাইট হওয়ার
পরে আমরা
মেহারী
ক্যাম্প
ছাইড়া
দিছিলাম। পাঞ্জাবি সব
ঐদিন আর আসতে
পারে নাই
এইখানে। সব চইলা
গেছিল। পরের
দিন
পাঞ্জাবিদের
দুইটা লাশ আমি
দেখছি। খাল
দিয়া ভাইসা
যাইতেছিল। মেহারী থেকে
আমরা গেলাম
শিমরাইলে। মিশরাইল যে
ফাইটিং হইল
যার কথা বললাম
কিছুক্ষণ আগে
আলমগীর সে
ফাইটে মারা
যায়।
প্র:
পাকিস্তানি
সামরিক
বাহিনী আপনার
এলাকায় কোন
ধরনের
অত্যাচার
করেছে ?
উ: এরাতো
খুবই
অত্যাচার
করছিল। আমার
গ্রামের ১৭/১৮
জন লোককে
একসাথে গুলি
কইরা মারছে
তারা। শুধু
তাই না,আমার গ্রাম
জ্বালাই দিছে। আমার
নিজের বাড়িতো
পাঞ্জাবিরা
সব ভাইংগা
টাইংগা নিয়া গেছিল। দেশ
স্বাধীনের পর
আইসা দেখি
আমার ঘর-টর
নাই। এই ঘর
আমরা পরে করছি।
প্র:
আপনার গ্রামে
যখন পাক
হানাদার
বাহিনী আক্রমণ
করেছিল সেই
ঘটনার কথা কি
আপনার কিছু
স্মরণে আছে?
উ: ঐদিন
পাঞ্জাবিরা
আমাদের এই
বটগাছ পর্যন্ত
গোলাগুলি
কইরা গেছে। তখন কিন্তু আমি এই
বাড়িতে। আমি দেখতেছি
পাঞ্জাবিরা
কি করতেছে। এক বেচারা
চালচাষ
করতেছে তার
ছেলে আওয়ামী
লীগের
নেতৃত্ব
দিছে-আমাদের
গ্রামের আবু। আবুর বাপ,তার
নামটা আমি
ভুইলা গেছি। আবুর
বাপকে কিন্তু প্রথম
গুলি করছে
পাঞ্জাবিরা। সে হাল
চাষ করতেছিল। আর
বাকিগুলারে
লাইন ধইরা
দাঁড়া করাইয়া
মারছিল। সেদিন ছিল
শুক্রবার। ওসমান মিয়া,নূর
বক্স,সোনা
মিয়ার ছেলে
শরব আলী তাকে
মারছে
বটগাছের এইখানে। এরপরে
মালুমিয়া,আবুল
খায়ের
মাস্টার,হুমায়ুন
সাব
এ্যাসিস্ট্যান্ট
ইঞ্জিনিয়ার-নূর
ইসলাম
মেম্বারের বড়
ছেলে,লিটন
মিয়া,মোল্লাবাড়ির
হারু মিয়া,আলী,আবদুল
আজীজ,জুজু
মিয়া এবং আমার
এক ফ্রেন্ড পাকিস্তানিদের
হাতে মারা যায়। এর মধ্যে
একজন বাইচ্ছা
গেছে। সে
বোধহয়
মুহুরীগিরি
করে।
প্র:
আপনার এলাকায়
শান্তি
কমিটিতে কারা
ছিল?
উ: শান্তি
কমিটির
চেয়ারম্যান
ছিল নূর ইসলাম
মেম্বার। আমার
গ্রামের নূর
ইসলাম
মেম্বার
সাহেব ও মৌলুক
হোসেন
চেয়ারম্যান ছিল। আরেকজন
ছিল। সে নাকি
রাজাকারের
ব্রিগেডিয়ার
আছিল সিদ্দিক
মাস্টার। সে ছিল
আড়াইবাড়ি
এলাকার।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
এসে কি দেখলেন? গ্রামের
স্কুল,কলেজ,মসজিদ,মাদ্রাসা,রাস্তাঘাট,ব্রিজ
এগুলোর
অবস্হা কি
দেখলেন?
উ: অনেক
পুলইতো ভাংগা
ছিল-যেমন কালা
মিয়ার পুল। কসবার মহেশ
ভট্টর যে পুল
সেটা ভাঙা ছিল। আর আমার
গ্রামের কথা
আমার বাড়ির
কোনো ঘরদোর ছিল
না। আগুন
দিয়া পুড়াইছে। মোশাররফ
কনটক্টারের
বাড়ি আগুন
দিয়া পুড়াইছিল। আমি
যতটুকু শুনছি
আমার গ্রামে
দুইজন মেম্বার
ছিল। একটা
হইছে দক্ষিণ
পাড়ার
মেম্বার। আর অন্য
পাড়ার ছিল নূর
ইসলাম
মেম্বার। একচুয়েলি পাকিস্তানিরা
নাকি অপারেশন
করতে চাইছল
দক্ষিণ
পাড়াতে। কারণ,দক্ষিণ
পাড়াতে
আওয়ামী লীগের
সমর্থক ছিল
বেশি। আর
নূর ইসলাম
সাবের এলাকার
লোকজন ছিল
পাকিস্তানের
পক্ষের শক্তি। পাঞ্জাবিরা
খবর পাইছে মুক্তিযোদ্ধা
আসছে আকছিনা
গ্রামে এবং
তারা রযেছে
মেম্বারের
বাড়িতে। পাঞ্জাবিরা
আইসা রাস্তার
মধ্যে বলছে
মেম্বারের
বাড়ি কোথায়? গ্রামের
এক কৃষক নূর
ইসলামের বাড়ি
দেখাই দিছে। কোন
মেম্বার
পাঞ্জাবিরাতো
বুঝে নাই। ফলে ঐ বাড়িতে
অপারেশনটা
করচে,যার
জন্য নূর
ইসলাম সাবের
বড় ছেলে যে
সাব-এসিসস্ট্যান্ট
ইঞ্জিনিয়ার
হুমায়ূন মারা
যায়। শান্তি
কমিটির লিডার
মারা গেছে। তার ভাতিজা
মারা গেছে এই
বাড়ির ভিতরে। দক্ষিণ
পাড়ার সাইডটা
আমাদেরকে
সহযোগিতা করতো। আর ওরা
মুসরিম লীগ
করতো। এরা
আমাদেরকে
সহযোগিতা করে
নাই।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
আপনার অস্ত্র
কি করলেন?
উ: আমি তো
সেকশন
কমান্ডার
ছিলাম। আমার
স্টেনগান ছিল। আমি জমা
দিয়া দিছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : মোঃ সোলেমান
খান
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ৩ নভেম্বর
১৯৯৬
ক্যাসেট
:
কসবা
২৮