২১

 

৩রা ডিসেম্বর বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতার এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতাদানকালে ভারতের বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তানের বিমান-আক্রমণ শুরু হয় অবিলম্বে তিনি দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন মন্ত্রিসভার জরুরী বৈঠকের পর মধ্যরাত্রির কিছু পরে বেতার বক্তৃতায় তিনি ঘোষণা করেন, এতদিন ধরে বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে২৩শে নভেম্বর দশ দিনের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ইয়াহিয়ার যে বাসনা ব্যক্ত হয়েছিল এবং ঐ একই দিনে তাজউদ্দিন তার বেতার বক্তৃতায় ঘটনা-বিকাশের যদ্রূপ সম্ভাবনা উল্লেখ করেছিলেন, অবশেষে সেইভাবেই মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংকের শুরু হয়৪ঠা ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এক জরুরী লিপিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের সর্বশেষ আক্রমণের সমুচিত জবাব প্রদানে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মিলিত ভূমিকা সফলতর হতে পারে, যদি এই দুটি দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়২৪৯ ভারত ও বাংলাদেশ স্থলবাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত, ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও নৌবাহিনীর অবরোধের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধের চরিত্র ৪ঠা ডিসেম্বর থেকেই আমূল পরিবর্তিত হয়

 

পূর্ববর্তী সাত সপ্তাহ ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা এবং ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত বাহিনীর তীব্রতর সীমান্ত চাপের ফলে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই পাকিস্তানী বাহিনী বিরামহীন তৎপরতার দরুন পরিশ্রান্ত, বৈরী পরিবেশ ও অতর্কিত গোপন আক্রমণের ভয়ে শঙ্কিত, দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত হওয়ার ফলে দুর্বল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিটে খণ্ড-বিখণ্ডিত এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সামরিক সাফল্যের অভাবে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলসাত সপ্তাহ ধরে সংঘর্ষের পরিসর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এর পরিণতি ও লক্ষ্য সম্পর্কে পাকিস্তানী নেতৃত্বের উপলব্ধি ছিল ভ্রান্ত, তাদের প্রতিরক্ষার কৌশল ছিল অবাস্তব, বিমান ও নৌশক্তির সামর্থ্য ছিল নগণ্য এবং নেতৃত্বের পেশাগত মান নিম্ন দখলদার সৈন্যদের যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত ও হতোদ্যম করে তোলার পর মুক্তিবাহিনীর আট মাস দীর্ঘ সংগ্রামকে চূড়ান্তভাবে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে ৪ঠা ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় চারটি অঞ্চল থেকে: (১) পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে তিন ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ৪র্থ কোর সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-নোয়াখালী অভিমুখে; (২) উত্তরাঞ্চল থেকে দু ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ৩৩তম কোর রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া অভিমুখে; (৩) পশ্চিমাঞ্চল থেকে দু ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ২য় কোর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অভিমুখে; এবং (৪) মেঘালয় রাজ্যের তুরা থেকে ডিভিশন অপেক্ষা কম আর একটি বাহিনী জামালপুর-ময়মনসিংহ অভিমুখেএর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতের বিমান ও নৌশক্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ্ছন্ন কিন্তু সদা-তৎপর সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতাএই সমুদয় শক্তির সংমিশ্রণ ও সহযোগিতায় বাংলাদেশে পাকিস্তানী আধিপত্য স্বল্প সময়ের মধ্যে বিলোপ করার যথেষ্ট ছিল বস্তুত যুদ্ধারম্ভের সঙ্গে সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর বিজয় সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ কোন মহলেই ছিল না

 

পাকিস্তানের উচ্চতর নেতৃত্বের মধ্যেও এ বিষয়ে সংশয় থাকার কোন যুক্তি ছিল না; তৎসত্ত্বেও ৩রা ডিসেম্বর তারাই সংঘর্ষ সম্প্রসারণে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করে যেভাবেই হোক ইয়াহিয়াচক্রের মাঝে এ বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় রোধকল্পে তার সামরিক শক্তির সম্ভার নিয়ে যুদ্ধবিরতি এবং পূর্বতন স্থিতাবস্থা কায়েম করার জন্য তৎপর হয়ে উঠবে কার্যক্ষেত্রেও ঘটেছিল তাইফলে মার্কিন প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য পাল্টা আন্তর্জাতিক শক্তির সমাবেশ অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে এইভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংকে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত শক্তির প্রত্যাশিত বিজয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে মার্কিন প্রশাসন সৃষ্ট বিশ্ব ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে৪ঠা ডিসেম্বর বাংলাদেশের রণাঙ্গনে কোন বড় অগ্রগতি ঘটার আগেই ওয়াশিংটনে WSAG-এর বৈঠকে কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদের আহূত অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের দাবী সম্বলিত মার্কিন প্রস্তাব পেশ করার জন্য এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ব্যাপারে পাশ্চাত্য মিত্ররাষ্ট্রসমূহের সঙ্গেও আলোচনার কোন সময় তাদের ছিল নাএই ব্যস্ততা ছিল কিসিঞ্জারের নিজের ভাষায়, তাদের বৃহত্তর রণনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট২৫০ WSAG-এর বৈঠকে মার্কিন জয়েন্ট চীফ অব স্টাফ (JCS)-এর পক্ষে এ্যাডমিরাল জুমওয়াল্ট পাকিস্তানের সামরিক সরবরাহ পরিস্থিতি এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যেই সঙ্গীন হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করায় কিসিঞ্জারের ব্যস্ততার কারণ স্পষ্টতর হয় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর উচ্চতর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত এক প্রকাশ্য বিবৃতিতে উপমহাদেশের সংঘাতের জন্য মুখ্যত ভারতকে দায়ী করেন২৫১ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য স্ব স্ব সীমান্তের ভিতরে ফিরিয়ে নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা প্রদান করার জন্য এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন২৫২ কিন্তু এই প্রস্তাবে সমস্যার মূল কারণ তথা পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের উপর দীর্ঘ নির্যাতন এবং তার ফলে সৃষ্ট শরণার্থীর ভিড় ও সমস্যা জর্জরিত ভারতের অবস্থা বিবেচনা না করে ভারত ও পাকিস্তানকে একই মানদণ্ডে বিচার করায় সোভিয়েট প্রতিনিধি এই প্রস্তাবকে একতরফাবলে অভিহিত করে ভেটো প্রয়োগ করেন পোল্যান্ডও প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় ফ্রান্স ও ব্রিটেন ভোট দানে বিরত থাকে

 

পরদিন ৫ই ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় যে অধিবেশন বসে তাতে সোভিয়েট ইউনিয়ন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেএই প্রস্তাবে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক রাজনৈতিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘটবে প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পাক-বাহিনীর যে সহিংসতার দরুন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে তাও অবলিম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন২৫৩ একমাত্র পোল্যান্ড প্রস্তাবটি সমর্থন করেচীন বাদে পরিষদের অন্য সকল সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেচীন ভোট দেয় বিপক্ষেল্লিশ দিন আগে জাতিসংঘের সদস্যপদ এবং নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যের আসন লাভের পর একটিই ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রথম ভেটোঐ দিন আরও আটটি দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আর একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়এই প্রস্তাবের মর্ম পূর্ববর্তী মার্কিন প্রস্তাবের অনুরূপ হওয়ায় সোভিয়েট ইউনিয়ন তার দ্বিতীয় ভেটো প্রয়োগ করেএকই সময়ে তাস মারফত এক বিবৃতিতে সোভিয়েট সরকার উপমহাদেশের যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানকে সর্বাংশে দায়ী করেন, ‘পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবী জানান, এই সংঘর্ষ সোভিয়েট সীমান্তের সন্নিকটে সংঘটিত হওয়ায় এর সঙ্গে সোভিয়েট নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, বলে উল্লেখ করেন এবং পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে বিবদমান পক্ষদ্বয়ের যে কোনটির সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য বিশ্বের সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানান২৫৪ উপমহাদেশের সংঘর্ষে পাকিস্তানের সহায়তায় তার মিত্রদ্বয় কি ব্যবস্থা নিতে পারে, স্পষ্টতই তার সঠিক উপলব্ধির ভিত্তিতে এই সোভিয়েট বিবৃতি প্রচারিত হয়েছিল

 

৬ই ডিসেম্বরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্ঞাপিত হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কূটনৈতিক স্বীকৃতিএকই দিনে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের বিমান তৎপরতার ক্ষমতা লুপ্ত হওয়ার ফলে স্থলভূমিতে পাকিস্তানী বাহিনীর অপরিসীম চাপের সম্মুখীন হয়৬ই ডিসেম্বর থেকেই পাকিস্তানের সৈন্যরা ঢাকা ও সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে পশ্চাদপসরণ শুরু করেঐ দিন WSAG-এর বৈঠকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (CIA) প্রধান রিচার্ড হেলম্‌সের সমীক্ষায় বলা হয়, দশ দিনের মধ্যে ভারতীয় বাহিনী পূর্বাঞ্চলে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে সক্ষম হবে মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর সৈন্যাধ্যক্ষমণ্ডলী (JCS)-এর পক্ষে উপস্থিত জেনারেল ওয়েস্টমোরল্যান্ড বরং পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের প্রতিরোধের মেয়াদ তিন সপ্তাহ অবধি স্থায়ী হতে পারে বলে অভিমত দেনএর পরই শুরু হয় সামরিক হস্তক্ষেপের অনুক্ত পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে কিসিঞ্জারের সুচিন্তিত প্রশ্নমালা: পূর্ব পাকিস্তানের বিহারীদের হত্যা করা শুরু হয়েছে কি না, এই আসন্ন রক্তপাত বন্ধের উপায় কি, যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা সে দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে কি না, ভারতের নৌঅবরোধ বেআইনী কি না এবং তার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের খসড়া শীঘ্র তৈরী করা যাবে কি না, জর্ডান ও সৌদী আরব থেকে পাকিস্তানে সমরাস্ত্র পাঠানোর পথে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোন বাধা আছে কি না, যদি থাকেও প্রেসিডেন্ট নিক্সন যেহেতু পাকিস্তানের পরাজয় রোধ করতে চান, সেহেতু এই বাধাগুলি অপসারণের উপায় কি, ইত্যাদি২৫৫ সংক্ষেপে, সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে সম্ভাব্য যুক্তি ও উপায় অন্বেষণই ছিল ৬ই ডিসেম্বরের WSAG বৈঠকের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য দিক পাশাপাশি শুরু হয় বাংলাদেশে পাকিস্তানের আসন্ন পরাজয় রোধ করার জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র কূটনৈতিক চাপ প্রেসিডেন্ট নিক্সন সোভিয়েট নেতা ব্রেজনেভের কাছে প্রেরিত এক জরুরী বার্তায় জানান, সোভিয়েট ইউনিয়ন যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ভারতকে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় না করে তবে পরবর্তী মে মাসে প্রস্তাবিত রুশ-মার্কিন শীর্ষ বৈঠক অুনষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়২৫৬ এ ছাড়া সরাসরি ভারতের উপর জাতিসংঘের চাপ প্রয়োগ করার জন্য মার্কিন প্রশাসন 'Uniting for Peace' ধারার অধীনে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাবার জন্য তৎপর হন২৫৭

 

৭ই ডিসেম্বরে নিয়াজীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দুর্গ যশোরের পতন ঘটে ভারতের ৯ম ডিভিশন ঐ দিন এক রক্তাক্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে যশোর সেনাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে দেখতে পায়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ ভর্তি সুরক্ষিত বাঙ্কার সম্পূর্ণ জনশূন্য পাকিস্তানের বীর মুজাহিদ চার ব্যাটালিয়ান সৈন্যের এইরূপ অকস্মাৎ অন্তর্ধানে দেশের পশ্চিমাঞ্চল কার্যত মুক্ত হয়যশোর থেকে ঢাকা অথবা খুলনার দিকে বিক্ষিপ্ত পলায়নপর পাকিস্তানী সৈন্যরাই অন্যান্য স্থানে স্বপক্ষীয় সৈন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে; দু-তিনটি স্থান বাদে সর্বত্রই পাকিস্তানীদের প্রতিরক্ষার আয়োজনে ধস নামে৭ই ডিসেম্বরে ভারতীয় বাহিনী সিলেটে হেলিকপ্টার যোগে অবতরণ করার পর মুক্তি বাহিনীর সহায়তায় সিলেট শহর মুক্ত করে ঝিনাইদহ ও মৌলভীবাজারও মুক্ত হয় একই দিনে ভারতীয় বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানী জওয়ান ও অফিসারদের উদ্দেশে শুরু হয় ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশর মনস্তাত্ত্বিক অভিযান: বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার আগে বরং ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণই পাকিস্তানীদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ

 

যশোরের পতন পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মূল কেন্দ্রকে নাড়া দেয় প্রবলভাবেসাত তারিখেই গভর্নর আবদুল মালেক পূর্বাঞ্চলের সৈন্যাধ্যক্ষ লে. জে. নিয়াজীর অভিমত উদ্ধৃত করে এক দুর্গত বার্তায় ইয়াহিয়াকে জানান, যশোরের বিপর্যয়ের ফলে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পতন প্রায় সম্পন্ন এবং মেঘনার পূর্বদিকের পতনও কেবল সময়ের প্রশ্ন; এই অবস্থায় আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সামরিক সহায়তা না পৌঁছায়তবে জীবন রক্ষার জন্য বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করা বাঞ্ছনীয়২৫৮ গভর্নর মালেকের এই দুর্গত বার্তা ইসলামাবাদের কর্তৃপক্ষের জন্য আরও বেশী দুর্ভাগ্যজনক ছিল এ কারণে যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে তাদের আকাঙ্ক্ষিত অগ্রাভিযান তখনও কোন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, একমাত্র ছম্ব এলাকায় কিছু অগ্রগতি ছাড়া উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোন বড় বা মাঝারি ভূখণ্ড দখল করার আগেই পূর্ব বাংলায় তাদের সামরিক নেতৃত্ব যদি আত্মসমর্পণের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে তবে সমূহ বিপর্যয় কাজেই মালেকের দুর্গত বার্তা ঐ সন্ধ্যাতেই হোয়াইট হাউসে পৌঁছানো হয় সম্ভবত অবিলম্বে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য মালেকের আবেদনকে আকুলতর করেই২৫৯ পাকিস্তান যাতে পূর্বাঞ্চলে পরাজিত না হয় তদমর্মে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পেন্টাগণের সুপারিশ কিসিঞ্জারের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল ঐ দিনইফজল মুকীম খানের বর্ণনা অনুসারে এরও দুদিন আগে অর্থাৎ ৫ই ডিসেম্বর থেকে নিয়াজীর মনোবল ঠিক রাখার জন্য পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি আবদুল হামিদ আসন্ন চীনা হস্তক্ষেপের সংবাদ নিয়াজীকে দিয়ে চলেছিল২৬০ উত্তরের গিরিপথের প্রায় সব কটিই তখনও বরফমুক্ত কিন্তু সিংকিয়াং সীমান্তে সোভিয়েট স্থল ও বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির তাৎপর্য চীনের জন্য উপক্ষেণীয় ছিল না

 

নিক্সন প্রশাসনের জন্যেও সমস্যা তখন কম নয় বস্তুত পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা মার্কিন জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করানো তখন এক দুঃসাধ্য ব্যাপারকি মানবিকতার যুক্তিতে, কি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা থেকে, মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান নীতি নিয়ে মার্কিন গণপ্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যমগুলির সমালোচনা তখন তুঙ্গে মার্কিন সিনেটে এবং হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাট দলীয় কোন কোন সদস্য পাকিস্তানী জান্তার গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী নীতির প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন এবং জাতিসংঘের বিলম্বিত ও একদেশদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন২৬১ মানবতাবাদী কারণ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরেট জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশ থেকে উপমহাদেশের সংঘর্ষের জন্য ভারতকে এককভাবে দোষী করা, ভারতের উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করা প্রভৃতি বিষয়ে মার্কিন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার যৌক্তিকতা সম্পর্কে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি নানা প্রশ্ন তোলে জনমতের এই প্রচণ্ড বিরুদ্ধতা দৃষ্টে ৭ই ডিসেম্বর কিসিঞ্জার নিজেই এক অজ্ঞাতনামা সরকারী মুখপাত্র হিসাবে আস্থাভাজন কিছু সাংবাদিকদের কাছে পরিবেশিত এক সমীক্ষার দ্বারা মার্কিন জনমত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন২৬২

 

কিসিঞ্জারের এই বেনামী সমীক্ষা মার্কিন জনমতকে পরদিন কতটুকু বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হত তা অজ্ঞাত থাকলেও, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উপমহাদেশের যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে সে দিন যে রায় দেন, তা-ই মার্কিন সরকারের পরবর্তী কার্যক্রমের প্রধান মূলধনে পরিণত হয় সাধারণ পরিষদ ৭ই ডিসেম্বর রাত্রিতে-উপমহাদেশে তখন ৮ই ডিসেম্বর- অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, উভয় পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার এবং শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান সম্বলিত এক প্রস্তাব ১০৪-১১ ভোটে গ্রহণ করে প্রত্যেক বক্তার জন্য সর্বাধিক দশ মিনিট বরাদ্দ করে উপমহাদেশের এই অত্যন্ত জটিল বিষয়কে অসম্ভব তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ পরিষদে আলোচনা করার ফলে অধিকাংশ সদস্য দেশের জন্যই বাহ্যত যুক্তিসঙ্গত এই প্রস্তাবের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নিতা ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্যই অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক অসন্তোষ এবং বিবদমান প্রতিবেশীর উপস্থিতি এক সাধারণ সমস্যাফলে বিপুল ভোটাধিক্যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় সোভিয়েট ইউনিয়ন, সমাজতন্ত্রী কয়েকটি দেশ, ভারত এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী দ্বিতীয় দেশ ভুটান বাংলাদেশের অভ্যুদয় রোধ করার জন্য এই আন্তর্জাতিক কূটবুদ্ধির বিজয়ের মুখেও অটল থাকে উপমহাদেশের সংঘাতের জটিলতা সম্পর্কে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপলব্ধি অপেক্ষাকৃত গভীর ছিল বলে মার্কিন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই দুই দেশ এবং আরো আটটি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে

 

৮ই ডিসেম্বরের রণক্ষেত্রের অবস্থা পাকিস্তানের জন্য আরও শোচনীয় পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের মূল ভরসার স্থল ছম্বে উপর্যুপরি চেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায় অন্যত্রও অবস্থা বেশ খারাপ রাজস্থান-সিন্ধু সীমান্তে বরং ভারতের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়, করাচীর উপর ভারতীয় নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের অবস্থা ক্রমেই সঙ্গীন - যশোরের মত ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও পাক সৈন্যরা পালিয়ে আসেকুমিল্লার এক অংশের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং অন্য অংশের পাশ কাটিয়ে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনী এগুতে থাকে কিন্তু পাক বাহিনী এই পশ্চাদপসরণের পর ঢাকার চারপাশে নিজেদের অবস্থানকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হবে কিনা, তা তখনও অজ্ঞাত সংক্ষেপে, পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের কোন অগ্রগতি নেই; আর পূর্বে কেবল পশ্চাৎগতি পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের সম্যক বিপর্যয় দৃষ্টে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজীর মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে তাকে জানায়২৬৩ এহেন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মাঝে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তার শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘ দিনের ওয়াদা বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে নুরুল আমিন ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন অন্যত্র ভারতে একই দিন অর্থাৎ ৮ই ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় সর্বশেষ সামরিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থতির আলোকে ভারতের সরকারী মুখপাত্র ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে অন্যান্য সকল অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে; বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই কোন ভূখণ্ড দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই২৬৪

 

এই ঘোষণা বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বাদে ওয়াশিংটন সময় সকাল এগারটায় যখন WSAG-এর বৈঠক শুরু হয়, তখন JCS-এর জেনারেল রায়ান উপমহাদেশের সর্বশেষ সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন যে, পশ্চিমাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর জোর এগুবার কোন লক্ষণ নেই, বরং পাকিস্তানের অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে রেখেই তারা সন্তষ্ট রয়েছে বলে মনে হয়২৬৫  কিন্তু WSAG-এর সভাপতি হেনরী কিসিঞ্জার রায়ানের কাছে জানতে চান পূর্ব রণাঙ্গন থেকে ভারতীয় সৈন্যদের পশ্চিম রণাঙ্গনে নিয়ে যেতে কত সময় লাগতে পারে জেনারেল রায়ান জানান, বেশ কিছু দিন; তবে বিমানবাহিত ব্রিগেড তাড়াতাড়িই নিয়ে যাওয়া সম্ভব, পাঁচ বা ছদিনের মধ্যেই২৬৬ তৎসত্ত্বেও এক সম্পূর্ণ নতুন আশঙ্কার অবতারণা করে কিসিঞ্জার বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হল ভারত যদি আজাদ কাশ্মীর দখলের চেষ্টা চালায় এবং পাকিস্তানের বিমান ও সাঁজোয়া বাহিনীর ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হয়, তবে তা হবে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য ভারতের ইচ্ছাকৃত উদ্যোগ কিসিঞ্জার অতঃপর আবেগময় ভাষায় সমবেতদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রকে সম্পূর্ণ পরাভূত হতে দিতেএবং পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিবৃত্ত রাখার জন্য ভারত যদি ভয় দেখায় তা কি আমরা মেনে নিতে পারি’? স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি সিস্কো বলেই বসেন, ভাø