২২
১৬ই
ডিসেম্বর
ঢাকায় যেদিন
পাকিস্তানী
বাহিনী
আত্মসমর্পণ
করে, ঠিক
সেদিনই
কোলকাতায়
প্রবাসী সদর
দফতর থেকে বাংলাদেশ
সরকার সমগ্র
দেশে
বেসামরিক
প্রশাসন
ব্যবস্থা
পুনঃপ্রতিষ্ঠার
জন্য নবনিযুক্ত
জেলা
প্রশাসকদের
কাছে
প্রয়োজনীয়
নির্দেশাবলী
পাঠাতে শুরু
করেন। শত্রুমুক্ত
বাংলাদেশে
বেসামরিক
প্রশাসনযন্ত্র
প্রতিষ্ঠা
এবং তার জরুরী
করণীয়
নির্ধারণের
জন্য ২২শে
নভেম্বরে
বাংলাদেশ
মন্ত্রিসভা
সচিবদের
সমবায়ে যে
সাবকমিটি গঠন
করেছিলেন
(পরিশিষ্ট ঠ-এ
বর্ণিত), সেই
সাবকমিটি এবং
পরিকল্পনা
সেল পাশাপাশি
এ যাবত কাজ
করে চলেন। ফলে
বেসামরিক প্রশাসন
এবং আইন ও
শৃঙ্খলার
পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ
ও পরিবহন
ব্যবস্থার
পুনঃস্থাপন, অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডের
পুনরুজ্জীবন, শরণার্থীদের
প্রত্যাবর্তন
ও পুনর্বাসন, খাদ্য
ও জ্বালানিসহ
জরুরী পণ্য
সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পাকিস্তানের
আধা-সামরিক
বাহিনী ও
সশস্ত্র সমর্থকদের
নিষ্ক্রিয়করণ, সরবরাহকৃত
অস্ত্রশস্ত্রের
পুনরুদ্ধার, জাতীয় পুনর্গঠনের
কাজে
মুক্তিযোদ্ধাদের
নিয়োগ
প্রভৃতি বিষয়ে
সচিব-সাবকমিটি
ও পরিকল্পনা
সেলের
সুপারিশসমূহ
মন্ত্রিসভার
বিবেচনা ও
অনুমোদনের
জন্য হাজির
করা হয়।৩২৮ বিভিন্ন
বিষয়ে
মন্ত্রিসভার প্রয়োজনীয়
সিদ্ধান্তের
পর জেলা
পর্যায়ে
জরুরী করণীয় ও
দায়িত্ব
সম্পর্কে
জেলা
প্রশাসকের
প্রতি নির্দেশপত্র
প্রেরিত হয় ৩২৯ ৭ই ডিসেম্বর
যশোর মুক্ত
হওয়ার পর থেকে
১৫ই ডিসেম্বরের
মধ্যে উনিশটি
জেলার জন্য
জেলা প্রশাসকদের
মনোনয়ন ও
নিয়োগ
সম্পন্ন হয়। ১৭ই
ডিসেম্বর ঐ সব
জেলার সহকারী
প্রশাসক পর্যায়ে
নিয়োগ করা হয়
আরো ছ’চল্লিশজন
অফিসার।
জেলা
প্রশাসকদের
কাছে প্রেরিত
নির্দেশপত্রে
আইন ও শৃঙ্খলা
প্রতিষ্ঠার
দায়িত্ব ছিল
সর্বাগ্রে। সরকার ও
রাজনৈতিক
নেতৃবৃন্দের
পক্ষ থেকে প্রচারিত
বিভিন্ন
বিবৃতি এবং
স্বাধীন
বাংলা বেতার
কেন্দ্র
কর্তৃক প্রচারিত
আবেদনে মুক্ত
এলাকায়
শান্তি ও
শৃঙ্খলা
বিধানের জন্য
স্থানীয়
জনসাধারণ ও
মুক্তিযোদ্ধাদের
প্রতি
বারংবার
আহ্বান
জানানো হয়। প্রায় ন’মাস ধরে
হানাদার
বাহিনীর
হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতন
ও সন্ত্রাসের
রাজত্বকালে
যে সব স্থানীয়
অনুচরদের
কার্যকলাপ
মানুষের
দুর্গতির মাত্রা
বাড়িয়ে
তুলেছিল, তাদের
বিরুদ্ধে
নিপীড়িত
দেশবাসীর
পুঞ্জীভূত
ঘৃণা, ক্রোধ
ও প্রতিশোধ
স্পৃহা যে এক
ক্ষমাহীন সংকল্পে
পরিণত হয়েছে
তা কারো
অজ্ঞাত ছিল না। একবার এই
পুঞ্জীভূত
ঘৃণা ও
ক্রোধের
বিস্ফোরণ ঘটা
মাত্র সারা
দেশে নতুন করে
রক্তের
প্লাবন শুরু
হওয়ার আশঙ্কা
ছিল খুবই
প্রবল। এর
ফলে বিভিন্ন
দেশের
কূটনৈতিক
স্বীকৃতি আদায়
করাও যে
সাতিশয় দুরূহ
হয়ে পড়ত, সে বিষয়ে বাংলাদেশের
নেতৃবৃন্দের
কোন সংশয় ছিল
না। তাই
যুদ্ধ
চলাকালেই
মন্ত্রিসভা
পাকিস্তানী
অনুচর হিসাবে
অভিযুক্তদের
বিচার ও শাস্তির
আইনসঙ্গত
পন্থা
উদ্ভাবনের
জন্য প্রয়োজনীয়
সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করেন।৩৩০ এ ছাড়া
এ জাতীয়
হত্যাকাণ্ড
যাতে
কোনক্রমেই সংঘটিত
হতে না পারে
তজ্জন্য
মুক্তিবাহিনী
ও ভারতীয়
বাহিনীকে
সুস্পষ্ট
নির্দেশ
দেওয়া হয়।
বেসামরিক
প্রশাসন
পুনঃপ্রতিষ্ঠার
কর্মসূচী
কাগজপত্রে যত
নির্ভুলভাবেই
ব্যক্ত করা
হোক, প্রায়
ন’মাস
দীর্ঘ এক
রক্তক্ষয়ী
স্বাধীনতাযুদ্ধের
পর সারা দেশের
প্রশাসন, অর্থনৈতিক
অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা
প্রভৃতি
প্রতিটি
ক্ষেত্রই তখন
সর্বাংশে
বিপর্যস্ত। আইন ও
শৃঙ্খলা
প্রতিষ্ঠার
জন্য পুলিশ ও
নিরাপত্তা
বাহিনীর
শক্তি ছিল
নামে মাত্র। দেশের
আয়তন ও
সমস্যার
তুলনায়
বাংলাদেশের
নিজস্ব
সৈন্যবলও ছিল
অতিশয় নগণ্য। দেশের
অফিস-আদালত
ছিল জনশূন্য, ডাক
বিভাগ
সম্পূর্ণ
বন্ধ; তার
বিভাগ প্রায়
অচল; অসংখ্য
ব্রীজ ও সেতু
বিধ্বস্ত
হওয়ায় রেল ও
সড়কপথে যোগাযোগ
প্রতি পদে
বিঘ্নিত; সচল
অসামরিক বাস ও
ট্রাক বিরল
বস্তু; যান্ত্রিক
জলযান
প্রায়শই
জলমগ্ন অথবা
বিধ্বস্ত; স্বর্ণ
ও বৈদেশিক
মুদ্রা তহবিল
বলতে কোন কিছুর
অস্তিত্ব নেই; কলকারখানা
সব বন্ধ; বন্দর অচল
ও
বহির্বাণিজ্য
নিশ্চল। অন্যদিকে
পাকিস্তানী
নির্যাতনের
কবল থেকে জীবন
ও সম্ভ্রম
রক্ষার
প্রচেষ্টায়
দেশের ভিতরেই
তখন দেড় থেকে
দু’কোটি
লোকের
উদ্বাস্তুর
দশা; ভারতে
আশ্রয়লাভকারী
এক কোটি
শরণার্থীকেও
সেখানকার
সাধারণ
নির্বাচনের
আগে স্বদেশে
ফিরিয়ে আনার
তাগিদ রয়েছে। মোট প্রায়
আড়াই থেকে তিন
কোটি লোকের
পুনর্বাসন
ছিল দেশের
জরুরী সমস্যাগুলির
মধ্যে
সর্ববৃহৎ। খাদ্যশস্যের
ঘাটতি ৪০ লক্ষ
টন।৩৩১ স্বাধীনতা
অর্জনের
অব্যবহিত পরে
বাংলাদেশের
পরিস্থিতি
ছিল এমনই ঘোর
দুর্যোগপূর্ণ।
আইন ও
শৃঙ্খলার
পরিস্থিতি
একাধিক
কারণেই ছিল সব
চাইতে
সমস্যা-সঙ্কুল
ও বিপজ্জনক। নিয়মিত
বাহিনী ছাড়াও
গণবাহিনী
হিসাবে
ট্রেনিং দেওয়া
হয়েছিল ৮৪,০০০
মুক্তিযোদ্ধাকে।৩৩২ মুজিব
বাহিনীর
সংখ্যা ছিল
আরও দশ হাজার। এদের
প্রায় সবাইকে
অস্ত্র দেওয়া
হয়েছিল। তৎপরতার সময়
অস্ত্র
খোয়ানো
মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্য খুব বিরল
ঘটনা ছিল না; এদের
মধ্যে যারা
মোটামুটি
দক্ষ হিসাবে
বিবেচিত
হয়েছিল, সেই সব
যোদ্ধাদের
পুনরায়
অস্ত্র দেওয়া
হয়। এ ছাড়া
টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, বরিশাল, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ
প্রভৃতি
অঞ্চলে মূলত
স্থানীয় প্রশিক্ষণ
ও উদ্যোগের
ভিত্তিতে যে
সব বাহিনী গ্রুপ
এক ধরনের
গেরিলা
পদ্ধতিতে লড়াই
করে চলেছিল
তাদেরকেও বিভিন্ন
দফায় অস্ত্র
সরবরাহ করা হয়। এক
নির্ভরযোগ্য
ভারতীয় সূত্র
অনুসারে, নিয়মিত
বাহিনীর জন্য
স্বতন্ত্র
বরাদ্দ বাদে, কেবল
মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্য
সরবরাহকৃত
মোট অস্ত্রের
সংখ্যা ছিল
প্রায় এক লক্ষ
পঞ্চাশ হাজার।৩৩৩
সরবরাহকৃত এই
বিপুল
অস্ত্রশস্ত্রের
সম্ভাব্য
অপব্যবহারে
স্বাধীনতা-উত্তর
বাংলাদেশের
আভ্যন্তরীণ
নিরাপত্তা
বিপন্ন হয়ে
উঠতে পারে, এই
আশঙ্কা থেকে
মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্য
গোলাগুলির (ammunition)
পরিমাণ
এমনভাবে
নিয়ন্ত্রিত
করা হত, যাতে
যুদ্ধের পর
তাদের হাতে
উদ্বৃত্ত
গোলাগুলি খুব
একটা অবশিষ্ট
না থাকে। কিন্তু
কার্যক্ষেত্রে
মুক্তিযোদ্ধাদের
সংখ্যাগরিষ্ঠ
অংশ
নিষ্ক্রিয়
হয়ে থাকায়, তাদের
অব্যবহৃত
গোলাগুলির
পরবর্তী
ব্যবহার
সম্পর্কে
কিছু
দুশ্চিন্তার
উদ্রেক ঘটে। কেন্দ্রীয়
কমান্ডকাঠামোবিহীন
মুক্তিযোদ্ধাদের
বিভিন্ন
ইউনিটের মধ্যে
রাজনৈতিক
বিভেদের
কারণে
তাদেরকে
নিয়ন্ত্রণে
রাখার
সমস্যাটি ছিল
জটিল। ক্ষমতার
পরিবর্তন
ঘটানোর জন্য ‘মুজিব
বাহিনীর’ একাংশের
কার্যকলাপ
এবং
চীনাপন্থী
হিসাবে পরিচিত
কোন কোন উগ্র
বামপন্থী
গ্রুপের
বিঘোষিত
ভূমিকার দরুন
মুক্তিযোদ্ধাদের
নিয়ন্ত্রণের
সমস্যা
জটিলতর হয়। সাধারণভাবেই
এক বর্বর
সেনাবাহিনী ও
তাদের স্থানীয়
সহযোগীদের
বিরুদ্ধে
দীর্ঘ কয়েক
মাস অস্ত্র
ধারণের পর এই
সব তরুণদের
মনোজগতে যে বিপুল
আলোড়ন এবং
মূল্যবোধের
যে বিরাট
রূপান্তর ঘটে, স্বাধীনতা
অর্জনের পর
স্বাভাবিক
জীবনযাত্রায়
ফিরে যাওয়ার
পরেও তা
কতখানি প্রবল
থাকবে বা
কিভাবে তার
আত্মপ্রকাশ
ঘটবে, তা
ছিল সর্ববৃহৎ
প্রশ্ন।
কিন্তু
পাকিস্তানের
আত্মসমর্পণের
অব্যবহিত পর
আইন ও
শৃঙ্খলার
ক্ষেত্রে সব
চাইতে বড় বিপদ
আশঙ্কা করা হয়
পাকিস্তানের
আধা-সামরিক বাহিনীসমূহের
মধ্যে গোঁড়া
ইউনিটগুলিকে
নিয়ে। পাকিস্তানী
সেনাবাহিনী
কর্তৃক মিশ্র
উপাদানে গঠিত
রাজাকার, সশস্ত্র
জামাতে
ইসলামীদের
দ্বারা গঠিত
আল-বদর এবং
সশস্ত্র
বিহারীদের
আল-শামস্-এই
তিন
আধা-সামরিক
বাহিনীর
সদস্য সংখ্যা
ছিল ৬০/৭০
হাজার। এ
ছাড়া যুদ্ধের
শেষ দিকে
পাকিস্তানীরা
বিহারী ও
জামাতে
ইসলামী
কর্মীদের
মধ্যে অকাতরে
অস্ত্রশস্ত্র
বিতরণ করে বলে
জানা যায়। পাকিস্তানের
বিপর্যয়ের
সঙ্গে সঙ্গে
এদের অধিকাংশই
আতঙ্কগ্রস্ত
হয়ে আত্মগোপন
করার অথবা
মফস্বল ও ভারত
অভিমুখে
পালিয়ে যাবার
চেষ্টা করলেও
এদের
ধর্মান্ধ ও
প্রতিহিংসাপরায়ণ
অংশের পক্ষে
কোন বেপরোয়া
কাজই অসাধ্য
ছিল না। পাকিস্তান
সমর্থক গোঁড়া
অংশকে চিহ্নিত
করে তাদের
নিবৃত্ত না
করা পর্যন্ত
ঢাকা শহরকে
বিপদমুক্ত
হিসাবে গণ্য
করা অসম্ভব হত। নিয়াজীর
আত্মসমর্পণের
কয়েক ঘণ্টা
বাদেই ইয়াহিয়া
খান ‘পূর্ণ
বিজয় লাভ
পর্যন্ত
যুদ্ধ চালিয়ে
যাবার সংকল্প’ ঘোষণা
করায় এবং
দক্ষিণ
বঙ্গোপসাগরে
সপ্তম নৌবহর
পূর্ণ
শক্তিতে
উপস্থিত
থাকায়, নবতর
যুদ্ধের
আশঙ্কা তখনও
সর্বাংশে
তিরোহিত নয়।
এই
পটভূমিতে
ঢাকায় উপনীত
ভারতীয়
সামরিক কমান্ড
শহরের
পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে
না-আসা পর্যন্ত
বাংলাদেশ
মন্ত্রিসভার
নিরাপত্তা
বিধানে তাদের
সামরিক
অক্ষমতা
জ্ঞাপন করেন। এর ফলে
এবং ভারত
সরকারের
সঙ্গে
অত্যন্ত জরুরী
বিষয়াদি নিয়ে
আলোচনা করার
প্রয়োজনে তিন
অথবা চার দিন
বাদে
মন্ত্রিসভার
প্রত্যাবর্তনের
সম্ভাব্য দিন
স্থির করা হয়। তার আগে
ঢাকায়
ন্যূনতম
প্রশাসনিক
কাঠামো গড়ে
তোলার
উদ্দেশ্যে
বাংলাদেশ
সরকারের
সেক্রেটারী
জেনারেল
রুহুল
কুদ্দুসের
নেতৃত্বে বাংলাদেশ
সরকারের
সচিবদের একটি
দল ১৮ই
ডিসেম্বর
ঢাকা এসে
পৌঁছান। একই দিনে
আওয়ামী লীগের
কয়েকজন
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও
ঢাকা আসেন। ১৯শে
ডিসেম্বর
থেকে স্বল্প
সংখ্যক
অফিসার ও কর্মচারীদের
উপস্থিতিতে
কেন্দ্রীয়
সেক্রেটারীয়েট
প্রতিষ্ঠার
কাজ শুরু হয়।
ঢাকায় আইন ও
শৃঙ্খলা
পরিস্থিতি যে
কত জটিল তা
১৭ই ডিসেম্বর
থেকে ক্রমশ
উন্মোচিত হতে
শুরু করে। ১৬ই
ডিসেম্বর
রাত্রি থেকে
বিজয়োল্লাসে
মত্ত যে সব ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পথে
পথে ঘুরে
বেড়াচ্ছিল
১৭ই ডিসেম্বর
দেখা যায়
তাদের অনেকের
হাতেই চীনা AK৪৭
রাইফেল ও
স্টেন গান।৩৩৪ এই সব
অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের
সরবরাহ করার
কোন প্রশ্ন ছিল
না। বস্তুত
এই সব
অস্ত্রধারীরা
অধিকাংশ
ক্ষেত্রে
কখনো
মুক্তিযোদ্ধাও
ছিল না-অন্তত
মুক্তিযোদ্ধাদের
কোন ইউনিট
নেতাই এদের
সনাক্ত করতে
পারেনি। জানা যায়, এতদিন
যে সব তরুণ
মুক্তিযুদ্ধে
যোগদান না করে - এবং
কোন কোন
ক্ষেত্রে সচ্ছল
বা
প্রভাবশালী
অভিভাবকদের
নিরাপদ আশ্রয়ে - বসবাস
করছিল তারাও
পাকিস্তানের
পরাজয়ের পর বিজয়
উল্লাসে
বিজয়ী পক্ষে
যোগ দেয়। মুখ্যত এদের
হাতেই ছিল
পাকিস্তানী
সৈন্য এবং
সমর্থকদের
ফেলে দেওয়া
অস্ত্র অথবা
অরক্ষিত
পাকিস্তানী
অস্ত্রাগার
থেকে লুঠ করা
অস্ত্রশস্ত্র
এবং অঢেল
গোলাগুলি। ১৬ই
ডিসেম্বর
নিয়াজীর
আত্মসমর্পণের
পর এই বাহিনীর
উৎপত্তি ঘটে
বলেই অচিরেই
ঢাকাবাসীর কাছে
এরা 'Sixteenth Division' নামে
পরিচিত হয়ে
ওঠে।
কালক্ষেপণ
না করে এদেরই
একটি অংশ
অন্যের গাড়ী, বাড়ী, দোকানপাট, স্থাবর
ও অস্থাবর
বিষয়সম্পত্তি
বিনামূল্যে
বা নামমাত্র
মূল্যে দখল
করার কাজে
ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। এদের
পিছনে তাদের
সৌভাগ্যান্বেষী
অভিভাবক বা
পৃষ্ঠপোষকদের
সমর্থন
কতখানি ছিল
বলা শক্ত, তবে
১৯৪৭-৪৮ সালে
ভারত-বিভাগ ও
দাঙ্গার পর এই
প্রক্রিয়াতেই
অনেক
বিষয়সম্পত্তির
হাতবদল ঘটেছিল। সুযোগসন্ধানী
‘সিক্সটিনথ
ডিভিশন’ সৃষ্ট এই
ব্যাধি
অচিরেই
সংক্রমিত হয়
মুক্তিযোদ্ধাদের
একাংশের
মধ্যে। তারপর
কে যে ‘সিক্সটিনথ
ডিভিশনের’ লোক, কে যে
মুক্তিযোদ্ধা
আর কে যে
দলপরিবর্তনকারী
রাজাকার
- সব
যেন একাকার
হয়ে এমন এক
লুঠপাটের
রাজত্ব শুরু
করে যে, ঢাকা শহরে
নিয়ন্ত্রণ ও
নিরাপত্তা
প্রতিষ্ঠার
সর্বাধিক
জরুরী
দায়িত্ব পালন
ছাড়াও ভারতীয়
সেনাবাহিনীকে
পুলিশী
ব্যবস্থা
গ্রহণে
ব্যস্ত হয়ে
পড়তে হয়।৩৩৫
অন্যদিকে
পাকিস্তানীদের
স্থানীয়
অনুচরদের
বিরুদ্ধে
স্বজন হারানো, লাঞ্ছিত
ও নিগৃহীত
দেশবাসীর
পুঞ্জীভূত
ক্রোধ এবং
তাদের প্রতি
সহানুভূতিসম্পন্ন
মুক্তিযোদ্ধাদের
ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণ
করা ছিল এক
দুরূহ
ব্যাপার। ভারতীয়
সেনাবাহিনী
রেডক্রসের
অভয়াশ্রয় হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টাল
এবং পাক
বাহিনী ও বিহারী-অধ্যুষিত
অঞ্চলের
চারদিকে
প্রয়োজনীয়
নিরাপত্তাবেষ্টনী
গড়ে তোলে ঠিকই, কিন্তু
তা নিয়ে
ভারতীয়
বাহিনীর বিরুদ্ধে
মুক্তিযোদ্ধাদের
একাংশের
মধ্যে ক্ষোভের
সঞ্চার ঘটতে
থাকে। দৃশ্যত
মুক্তিযোদ্ধাদের
ইউনিট
কমান্ডারদের
মধ্যে কারো
কারো পক্ষে
তাদের
সহযোদ্ধাদের
নিয়ন্ত্রণ
করাও
সাধ্যাতীত
হয়ে পড়ে।৩৩৬ এহেন
অবস্থার মাঝে
১৮ই ডিসেম্বর
রায়ের বাজারে
কাটাসুর নামক
এক ইটখোলার
খাদে হাতবাঁধা
অবস্থায়
দেশের
বিশিষ্ট
বুদ্ধিজীবীসহ
প্রায় দুইশত
ব্যক্তির
মৃতদেহ
আবিষ্কৃত
হওয়ায় মানুষের
ক্রোধ, ঘৃণা ও
প্রতিহিংসার
আবেগ চরমে
পৌঁছায়।৩৩৭
ঐ দিন
সন্ধ্যায়
ঢাকার প্রথম
গণজমায়েতে
মুক্তিযোদ্ধাদের
কতিপয় নেতা
শান্তি ও
শৃঙ্খলার
আবেদন জানিয়ে
বক্তৃতা শেষ
করার পর হঠাৎ
কি আবেগবশত
বিদেশী
সাংবাদিক ও
টেলিভিশন
ক্যামেরার সামনে
অজ্ঞাত
অভিযোগে ধৃত
চারজন
বন্দীকে আধ ঘণ্টাকাল
ধরে পিটিয়ে
অবশেষে
বেয়োনেটবিদ্ধ
করে হত্যা করে। স্থলভূমির
মুক্তিযুদ্ধে
নিঃসন্দেহে
সর্বাপেক্ষা
সফল অধিনায়ক
টাঙ্গাইলের
আবদুল কাদের
সিদ্দিকী
কর্তৃক নিজ
হাতে এদের বেয়োনেটবিদ্ধ
করার সচিত্র
সংবাদ সারা
বিশ্বে ফলাও
করে প্রচারিত
হয়। বুদ্ধিজীবীদের
শবদেহ
আবিষ্কৃত
হওয়ার পর সারা
শহরে যখন
প্রবল
উত্তেজনা
বিরাজ করছিল, তখন
সেই অবস্থায়
কাদের
সিদ্দিকীর এই দৃষ্টান্ত
ভয়াবহ
রক্তপাতের
সূচনা করতে
পারে এই
আশঙ্কায়
ভারতীয়
বাহিনী কাদের
সিদ্দিকীকে
গ্রেফতার
করার উদ্যোগ
নেয়।
বিপুল
সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার
অধিনায়ক এবং
যথেষ্ট
রাজনৈতিক
প্রভাব ও জনপ্রিয়তার
অধিকারী
কাদের
সিদ্দিকীকে
গ্রেফতার
করার উদ্যোগ
ভারতীয়
বাহিনীর জন্য
সহজ সিদ্ধান্ত
ছিল না।৩৩৮ তা ছাড়া
ঢাকা ও দেশের
অন্যান্য অংশ
থেকে মুক্তিযোদ্ধা
ও পাকিস্তানী
সমর্থকদের
মধ্যে সংঘাত
সৃষ্টির খবর
আসছিল। ভারতীয়
সেনাবাহিনীর
মধ্যেও
গুরুতর
শৃঙ্খলাভঙ্গের
সূত্রপাত হয়
যখন দৃশ্যত
কিছু শিখ অফিসার
এবং তাদের অধীনস্থ
সেনা যশোর, ঢাকা, কুমিল্লা
ও
চট্টগ্রামের
মূলত
ক্যান্টনমেন্ট
এলাকায় এবং
খুলনার
ক্যান্টনমেন্ট
ও শিল্প
এলাকায়
লুঠপাট শুরু
করে; কিন্তু
তা ব্যাপক
আকার ধারণ
করার আগেই
তাদের ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের
দৃঢ়
হস্তক্ষেপে
বন্ধ হয়ে যায়। এই সব
ঘটনার ফলে
ভারতীয়
বাহিনীর ঊর্ধ্বতন
কমান্ড এই
সিদ্ধান্তে
পৌঁছান, আরও ৩/৪
দিনের আগে
ঢাকার
ন্যূনতম
শৃঙ্খলা আনয়ন
করা সম্ভব নয়।
মন্ত্রিসভার
স্বদেশ
প্রত্যাবর্তনের
আগে ঢাকায়
ন্যূনতম
নিরাপত্তার
প্রতিষ্ঠা
করা ভারতীয়
বাহিনীর মূল
উৎকণ্ঠা হলেও, মন্ত্রিসভার
প্রত্যাবর্তনে
বিলম্ব ঘটার প্রধান
কারণটি ছিল
অন্য। পাকিস্তানী
বাহিনীর
আত্মসমর্পণের
প্রায় সঙ্গে
সঙ্গে
বাংলাদেশ
সরকার নতুন
রাষ্ট্রযন্ত্র
প্রতিষ্ঠার
মূল
পরিকল্পনা ও
কর্মসূচী প্রণয়ন
করেন ঠিকই, কিন্তু
দীর্ঘ
মুক্তিযুদ্ধের
পর বাংলাদেশের
সামাজিক ও
অর্থনৈতিক
অবকাঠামোর
বিপর্যস্ত
অবস্থা এবং
পাকিস্তানভিত্তিক
অর্থনৈতিক
সত্তা থেকে
সহসা
বিচ্ছিন্ন হওয়ার
পর অর্থ ও
সম্পদের
চূড়ান্ত
অভাবের দরুন উক্ত
পরিকল্পনা ও
কর্মসূচী
অনুযায়ী নতুন
রাষ্ট্রযন্ত্রকে
সচল করা
কার্যত
অসম্ভব ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রকে
সচল করার মত
সম্পদ ও কারিগরি
সহায়তার
বাস্তব আয়োজন
ব্যতীত কেবল
মন্ত্রিসভার
প্রত্যাবর্তনের
মধ্য দিয়েই
বাংলাদেশ
সরকার কার্যকরভাবে
সক্রিয় হতে
পারতেন না। দ্বিতীয়ত, যে
প্রশ্নকে
কেন্দ্র করে
উপমহাদেশের
এই যুগান্তকারী
পরিবর্তন
সাধিত হয়, সেই এক
কোটি
শরণার্থীকে
ভারত থেকে
ফিরিয়ে আনার
নির্দিষ্ট
আয়োজন না করে
ঢাকা
প্রত্যাবর্তনের
জন্য
মন্ত্রিসভার
ব্যগ্রতা
প্রকাশ সঠিক
বা শোভনীয়
কোনটাই হত না।
যুদ্ধ শুরু হবার পর উপরোক্ত বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার পূর্ণ সুযোগ ছিল না। বিশেষত, বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিষয়ে সমস্ত কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিযুক্ত ভারতের প্রধান কর্মকর্তা ডি. পি. ধর সপ্তম নৌবহর উদ্ভূত জরুরী পরিস্থিতির জন্য ১১ই ডিসেম্বর থেকে যুদ্ধের সমাপ্তি অবধি মস্কোয় অবস্থান করছিলেন। ১৮ই ডিসেম্বরে ডি. পি. ধর কোলকাতা এসে পৌঁছাবার পর ২১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সকল প্রয়োজনীয় বিষয়ে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনা চলে এবং বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অনুরোধ ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করে। সেই সময় ঢাকা ও দিল্লীর মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থা যা ছিল, তাতে দু’দেশের সরকারের পক্ষে এতগুলি জরুরী বিষয়ে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করা এবং বিচ্ছিন্ন ও বিপর্যস্ত অর্থনীতির জরুরী পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ভারতীয় সহযোগিতার পরিসর নীতিগতভাবে স্বীকৃত হওয়ার পর স্থির হয়, বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট আয়োজন নিরূপণ করা এবং সরবরাহের কর্মসূচী প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে ২৩শে ডিসেম্বর এক উচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধিদল ঢাকা পৌঁছাবেন। এই সব ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করার পর অবশেষে ২২শে ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন